উপকূলের রাখাইনদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখা জরুরী

2

কে এম সোহেল আমতলী ঃ নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এড়িয়ে কোন জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় স্বস্তিতে থাকবে এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আছে বলে মনে হয় না। উপকূলের  আদিবাসী সম্প্রদায় রাখাইনদের রয়েছে বন জঙ্গল পরিস্কার করে আবাদি জমি তৈরি করে ফসল উৎপাদন করার ইতিহাস। কর্মঠ জাতি হিসেবে জীব জন্তুর সাথে লড়াই করে বাঁচার ঐতিহ্য।

 

আর তাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। রাখাইন সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্ম ভূলতে বসেছে অতীতের ইতিহাস। কর্মহীন অবস্থায় নিজেদের ঐতিহ্য হারিয়ে অস্তিত সংকটে ভূগছে । তারা ভূলতে বসেছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। তারা জানেনা, সংস্কৃতি হচ্ছে প্রচন্ড তাপদাহে ছায়াময় বৃক্ষের মতো। ক্লান্ত পথিকের কাছে গাছের ছায়া যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনি কোন জাতি বা গোষ্ঠীর কাছে সংস্কৃতি অনুরুপ। ছায়া এড়িয়ে যদি কেউ রোদে এসে দাঁড়ায় তাতে বৃক্ষের কিছু যায় বা আসে না। এ ক্ষেত্রে নির্বোধ পথিক ক্রমশ স্বস্তিহীন হয়ে পড়বে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তবে এ কথা সত্য যে, কেউ ছায়াময় বৃক্ষ ফেলে রোদে দাঁড়ালে যে এক পলকেই মারা যাবে, তা কিন্তু ঠিক নয়।

 

সে শুধু তার অস্তিতের বিলুপ্তির গোড়াপত্তন ঘটাবে মাত্র। কাজেই সুখ ও স্বস্তির শেকড় যে নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গোড়ায় বাঁধা, একথা কোন জাতিকেই ভুলে গেলে চলবেনা। রাখাইনদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তি পথে।

পৃথিবীর সব প্রজাতিই সংস্কৃতির অপরিবর্তনবাদ মেনে চলে। অতি দূরদর্শিতার কারণে হয়তো তারা জেনে গেছে যে প্রকৃতি আরোপিত সংস্কৃতি থেকে সরে আসা মানে সুখ ও স্বস্তি থেকে বিচ্যুৎ হওয়া। এ সরে আসা একসময় প্রজাতি বিলুপ্তির পর্যায়ে গড়াবে, এ বোধোদয় হয়তো তারা প্রজš§ পরম্পরায় পেয়ে যায়। এ কারণে মৃত্যুর আগমুহূর্তেও নিজ সংস্কৃতি থেকে তারা বিচ্যুত হয় না।

 

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উপকূলের আমতলী, তালতলী, বরগুনা ,কুয়াকাটার রাখাইনরা   আজ পর্যন্ত  এ বাস্তবতায় পৌঁছতে পারল না। ‘মহান সৃষ্টিকর্তা সকল শক্তির উৎস’Ñ এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই তাদের। তার ক্ষমতার ছায়া থেকেই প্রকৃতির সৃষ্টি। প্রকৃতি হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা নির্মিত মহাজাগতিক কম্পিউটার, যেখানে সব কার্যধারা সন্নিবেশিত আছে। সে মোতাবেক চলছে বিশ্ব। প্রকৃতির অন্যতম কাজ হচ্ছে জীবের জীবনচক্রকে এগিয়ে নেয়া এবং প্রজাতি যেন বিলুপ্ত হয়ে না যায় সেদিকে নজর রাখা। যেসব বৃক্ষ বসন্তে  পাতা ঝরায় তাকে প্রতি বসন্তেই পাতা ঝরাতে দেখা যায়। বসন্তে  পাতা ঝরানোই তার সংস্কৃতি। উলে¬¬খ্য, গাছের পাতা যদি না ঝরত তাহলে মাটির ওপরের হিউমাস স্তর ক্রমশ ক্ষয়ে গিয়ে মাটি গাছগাছালি জš§ানোর অনুপোযোগী হয়ে উঠত। বসন্তে  পাতা ঝরার এ সংস্কৃতি প্রকারান্তরে বৃক্ষকেই সুরক্ষা দেয়। মাটির ওপরের হিউমাস স্তর ছাড়া জীবন সঙ্গীন হয়ে উঠবে বলেই বৃক্ষ তার পাতা ঝরিয়ে হিউমাস স্তরকে সমৃদ্ধ করছে।

 

অর্থাৎ পাতা ঝরানোর এ সংস্কৃতি তার প্রজাতি রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। কাজেই এ সংস্কৃতি থেকে বৃক্ষের সরে আসা হবে নিজের গোড়ায় নিজে করাত চালানোর মতো। এ কারণেই হয়তো পাতা ঝরানো বৃক্ষকে পাতা না ঝরিয়ে বসন্ত  পার করতে দেখা যায় না। রাখাইনরা নিজেকে যতই উপকূলের আদিবাসি বলে আস্ফালন করুক না কেন সংস্কৃতির অপরিবর্তনবাদ মেনে চলার সামগ্রিক সুবিধা অন্যান্য প্রজাতি কড়ায়-গন্ডায় বুঝে না নিলে তারা অধরাই রয়ে যাবে। এর চেয়ে অস্তিত্ব বিলুপ্তির পূর্বাভাস আর কী হতে পারে? তা আমার জানা নেই।

 

কাজেই এ কথা সত্য যে সংস্কৃতির পরিবর্তন নেই। কেউ যদি আরোপিত সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে চায় তাহলে তাকে সুখ ও স্বস্তি থেকে বিচ্যুত হতে হবে। এ বিচ্যুতি কালপরিক্রমায় তার প্রজাতি বিলুপ্তির পথকে প্রশস্ত করবে। মনুষ্যকুল তা বুঝে ওঠার ক্ষমতা অর্জন করার পরও বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে, যার খেসারত হিসেবে তুমুল জাতিগত দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ছে তারা। ‘ধ্বংসই’ শেষ পরিণতি জানার পরও বিবদমান কোন পক্ষই কলহের ফাঁদ থেকে সরে আসতে পারছে না। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সংস্কৃতি হচ্ছে যে কোন জাতির সভ্যতার প্রাণ। এখানে উন্নত-অনুন্নতের প্রশ্নটি গৌণ। নিজ সংস্কৃতি অনুন্নত বলেই যে উন্নত সংস্কৃতিকে ধারণ করতে হবে এমনটি নয়।

 

বরং অনুন্নত সংস্কৃতির ধারক হয়ে উন্নত সংস্কৃতির তল্পীবাহক হওয়ার মতো চরম অসভ্যতা ও মূর্খতা আর দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না। বিষয়টি ঘি দিয়ে পান্তা ভাতের ফ্লেভার পরিবর্তনের মতো। কাজেই কোন জাতির নিজ সংস্কৃতি থেকে সরে আসা মানে অসভ্যতার অতলগহ্বরে তলিয়ে যাওয়া। সেই অতলের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী।

 

আজকের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হওয়াই যে দায়ী, তা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য। কাজেই সংস্কৃতির অপরিবর্তনবাদকে উপলব্ধিতে নিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থা সেই মতো সাজানো সব জাতির জন্য অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া এক জাতির হাতে অন্য জাতির মস্তক দ্বিখন্ডেনের ঘটনা কিছুতেই রোধ করা যাবে না। সংস্কৃতির অপরিবর্তনবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান বিশ্ব ব্যবস্থায় যদি পরিবর্তন আনা না হয়, তাহলে বিশ্বশান্তির পক্ষে যে যাই বলুক, তার সবটাই অর্থহীন কোলাহলে পরিণত হবে বলে মনে হয়। পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করার অব্যর্থ লক্ষ্য নিয়ে জাতিগুলো যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় শিগগিরই তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

 

 

এ অপ্রতিরোধ্য জিজ্ঞাসা পূরণের দিকে অগ্রসরের কারণেই একদিন সব জাতি হারিয়ে যাবে প্রকৃতির অতলগহ্বরে। বিলুপ্ত হওয়া সংস্কৃতি থেকে হয়তো দু-একজন বেরিয়ে এসে আবার শুরু করবেন পাথরে পাথরে ঘর্ষণ। রাখাইন এ সম্প্রদায় নতুন করে আগুন জ্বালাতে শিখবেন এমন আশা আমাদের সকলে। আবার শুরু হবে লাঙ্গল চষা। ইতিহাস ও নিজস্ব সংস্কৃতি পূনরুদ্ধার করতে এ প্রজন্ম তৎপর হবে এমনটাই আশা করছি।