এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে হতদরিদ্র সোহাগ

3

স্টাফ রিপোর্টারঃ এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এইচ এস সি) ভাল ফল (জি পিএ-৫) করায় দুশ্চিন্তায় পরেছে খাইরুল ইসলাম সোহাগের পরিবার।  বাড়ি থেকে ৩ কিলো মিটার দূরে কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। পিতৃহীন ও মাতৃ ¯েœহ বঞ্চিত সোহাগের উপজেলার মহিপুর থানার আজিমপুর গ্রামে তাঁর নানা বাড়ি। অসহায় হতদরিদ্র বৃদ্ধা নানু রেনু বেগম তাঁর ভবিষ্যৎ লেখাপড়া নিয়ে হতাশায় ভুগছেন।

সোহাগের পরিবার সুত্রে জানা গেছে, শারিরীক প্রতিবন্ধী মোসা. রিনা বেগম ও নাজমা বেগম দুই মেয়েকে নিয়ে  রেনু বেগমের সংসার। স্বামী মারা যাওয়ার পর অভাবের সংসারে দুই মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন। এরপর বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে দুমুঠো খেয়ে পড়ে থাকার জন্য কাজের আশায় সহায়-সম্বলনহীন দরিদ্র পরিবারটি  উপকুলের এ প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় মালিবাগে চলে যায়। সেখানে  সোহাগের বাবা মো. বাবুল হাওলাদার দিন মজুরের কাজ করতেন। রেনু বেগম বাসা বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। এভাবেই তাদের দিন চলে যায়।  জন্মের দের মাস পরে সড়ক দুর্ঘটনায় সোহাগের বাবা. বাবুল হাওলাদার মারা যায়। দুই মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে সমস্যায় পরেন রেনু বেগম। সোহাগের শারিরীক প্রতিবন্ধী মায়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁর বয়স আট মাস হলে নানু রিনা বেগমকে দ্বিতীয়বার বিয়ে দেন। তারপর থেকে সোহাগের লালন পালনের দ্বায়িত্ব নেয় নানু রেনু বেগম। ছোট্ট খুপরী একটি ঘর ৬০০ টাকায় ভাড়া নেন পরিবারের একমাত্র উপার্যনক্ষম এ নারী। বাসা বাড়িতে জিয়ের কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়ে কোন রকমে চলত দুই মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে তাঁর অভাবের সংসার। এভাবে কাটান চার বছর।

সোহাগের নানু রেনু বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, চার বছর বয়সে আশেপাশের ছেলে-মেয়েদের দেখে ওদের সাথে সোহাগ স্কুলে যেতে চাইত। আমি তখন হালিম মিয়ার  বাড়িতে কাজ করি এবং থাকি। তাঁর  সহায়তায় ওকে মনি আপার কাছে পড়তে পাঠাই। মনি আপা মালিবাগ চৌধুরীপাড়া বালক-বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এরপর সোহাগকে ওই স্কুলে ভর্তি করি। ওখানে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে। দিন দিন খরচ বেড়ে যায় আমি মহিলা সকলের খরচ যোগাতে পারি না। তারপর আবার বাড়ি আজিমপুর গ্রামে ফিরে আসি। গ্রামে এসে প্রথমে আমি বাসায় বাসায় খাওয়ার পানি সরবরাহের কাজ করতাম। এছাড়া পুকুরে , ডোবা নালা থেকে শাক-পাতা সংগ্রহ করে এখানের বাজারে বিক্রি করে যা পাই তাই দিয়ে চলি। এখানে আসার পর  আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দুরে ৩৬নং আমজেদপুর রেজিস্টার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওকে ভর্তি করি। ওই স্কুলে সোহাগ ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ও উপজেলায় ৭ম স্থান লাভ করে। বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে। ওই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এস এস সি পাস করে এবং কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজে ভর্তি হয়।

সোহাগের ভাল ফলাফল সম্পর্কে রেনু বেগম বলেন, ও পরীক্ষায় ভাল করছে । আমি লেখাপাড়া শিখিতে পারে নাই, নাতি ভাল পাশ করছে শুনে আমি খুশি হইছি। যত কষ্ট হউক ওকে আমি পড়াতে চাই । একটা চাকরী করতে পারলে আমাদের আর অভাব থাকবে না।

এইচ এস সিতে জিপিএ-৫ পেয়ে সোহাগ জানায়, এসএস সিতে আমি জিপিএ -৫ পেয়েছিলাম। আমার লেখাপড়ার জন্য নানুর অবদান সবচেয়ে বেশী। আমার জীবনে নানুই সব। পরীক্ষার আগে আমি কিছু দিন কলেজের ছাত্রাবাসে থেকেছি। নানু যেভাবে পেরেছে কষ্ট করে প্রতিদিন আমার জন্য ভাত নিয়ে যেত। কলেজের সকল শিক্ষদের কাছে আমি ঋনী। তাঁরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমি আরো পড়তে চাই।

কুয়াকাটা খানাবাদ কলেজের সহকারি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খান জানান, আমার ছাত্র সোহাগ অনেক মেধাধী। আনেক প্রতিকুলতার মাঝেও জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমি সব সময় ওর খোজ খবর নিতাম। সহযোগিতা পেলে অনেক ভাল করবে। আমি ওর সাফল্য কামনা করি।