কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন হযবরল ……এন্তার অভিযোগ

5

ডেস্ক রিপোর্ট: পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন হযবরল অবস্থা এবং এন্তার অভিযোগ রয়েছে। দালালদের দৌরাত্ম্য, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রাইভেট ক্লিনিকে প্রাকটিস হেতু উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কলাপাড়া হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মহিলা ওয়ার্ডে ৩৫জন এবং পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছে। কাগজ-কলমের হিসাব এটি। বাস্তবে অনেক রোগী শয্যায় নেই। ভর্তি হয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন। যেন কোন নিয়ম শৃঙ্খলা নেই। ডাঃ লোকমান হাকিমকে কলাপাড়ায় ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব দেয়ার পর থেকেই হাসপাতালের প্রশাসন ব্যবস্থায় বেহাল দশা। ভেঙ্গে পড়েছে চেন অব কমান্ড। ভারপ্রাপ্ত হয়েও তিনি তা নেমপ্লেটে লিখছেন না। ইউএইচএর একটি কক্ষ এবং তার নিজস্ব চেম্বারের জন্য আরও একটি কক্ষ তিনি দখল করে রেখেছেন। নিজে এনেসথেসিয়ার চিকিৎসক হয়েও ওই দায়িত্ব পালন না করায় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ থাকা সত্ত্বেও মার্তৃস্বাস্থ্য সেবা (সিজারিয়ান) বন্ধ হয়ে আছে উপজেলা স্বাস্থ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কারনে। অজ্ঞানের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ তার থাকলেও তিনি তা করছেন না। তাই বন্ধ হয়ে আছে ইওসি বিভাগ। বাধ্য হয়ে গরিব প্রসূতিরা ১০-২০ হাজার টাকা ব্যয় করে নিকটস্থ কোন ক্লিনিক কিংবা পটুয়াখালী-বরিশালে গিয়ে সিজার করে সন্তান প্রসব করছে। অথচ ইওসি বিভাগ চালু থাকাকালে ফি মাসে ৩০/৩৫ জন মা সিজারিয়ান সুবিধা নিত। পেত মাতৃ স্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের সহায়তা।

সূত্রটি আরও জানায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত কলাপাড়ায় মোট ১৪ হাজার ৮০ জন মা সন্তান প্রসব করেন। যার মধ্যে সিজারিয়ান পদ্ধতি অবলম্বন করেন ১১৮০ জন। ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ডাঃ আব্দুর রহিম সিভিল সার্জন হয়ে ঝালকাঠি বদলী হওয়ার পর থেকে এনেসথেসিস্ট ডাঃ লোকমান হাকিম ভারপ্রাপ্ত ইউএইচএ হিসাবে কলাপাড়ায় যোগদান করলেও ইওসি সম্পুর্ণভাবে বন্ধ হয়ে আছে। অথচ বর্তমানে কলাপাড়ায় প্রসুতির সংখ্যা সাত হাজার ২৬০ জন। তাই নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য ইওসি বিভাগ চালু করা একান্ত প্রয়োজন হলেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন। এছাড়া হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো: হাসানুজ্জামান এর বিরুদ্ধে রয়েছে এন্তার অভিযোগ। প্রতিমাসে চিকিৎসক, নার্স ও তৃতীয় শ্রেনীর ষ্টাফদের কাছ থেকে বেতন প্রদান করার সময় ৫০০-১০০০ টাকা বিভিন্ন অজুহাতে কেটে রাখছেন তিনি। এমন অবস্থা বছরের পর বছর চললেও মুখ খুলতে সাহস করছেনা কেউ। এসব অনিয়ম রোধে কলাপাড়ায় ছয় বছরের বেশি সময়কাল চাকরি করা কর্মচারীদের অন্যত্র বদলী করার একটি সিদ্ধান্ত হয় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায়। কিন্তু রহস্যজনক কারনে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। ইতিপূর্বে হিসাবরক্ষক হাসানুজ্জামান অন্যত্র বদলী হলেও অদৃশ্য শক্তির জোরে নিকট আত্মীয় ক্যাশিয়ার মোহসীন সহ আবার কলাপাড়ায় যোগদান করেন তিনি। কলাপাড়া হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও ষ্টাফদের দাবী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ক্যাশিয়ার, হিসাব রক্ষক সহ প্রায় এক যুগ ধরে একই স্থানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র বদলী করা হলে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ দিন বয়সী আবুবকরের মা মিতু বেগম জানান, অসুস্থ্য শিশুটিকে নিয়ে চার দিন হাসপাতালে অবস্থান করছে সে। এর মধ্যে একদিন সকালে ৫টাকা দামের একটি বনরুটি, একটি সাগর কলা এবং এক চিমটি চিনি দেয়া হয়েছে। আর কোন খাবার জোটেনি। একয়দিনে বিছানার চাঁদর বদলানো হয়নি। বালিশের কভার নেই। সর্বত্র ময়লা আবর্জনা। দুইটি বাথরুমের একটি দরজা অর্ধেক ভাঙ্গা, একটির নেই। বেসিন ভাঙ্গা। টয়লেটেরও একই দশা। ব্যবহার উপযোগিতা নেই। একই অবস্থা মহিলা ওয়ার্ডের। চারদিক দুর্গন্ধে একাকার। ময়না-আবুল দম্পতি ভর্তি হয়েছেন চারদিন আগে। একদিন আগে থেকে খাবার পাচ্ছেন। দুপুরে এক টুকরো ছোট্ট সাইজের রুই মাছ আর ডাল দিয়ে দুই বেলা খেতে দেয়া হয়েছে তাদের। এ বিভাগেরও দু’টি বাথরুমের নিচের অর্ধেক দরজা ভাঙ্গা। টয়লেটেরও অর্ধেক দরজা নেই। আম্বিয়া খাতুন ভর্তি আছেন ১০দিন ধরে। তার কথ্যমতে ১০দিন পর ফ্লোর মোছা হয়েছে। গোটা হাসপাতালের বেহাল দশার এটি খন্ডচিত্র। আলাউদ্দিন বিশ^াস ও বিলকিছ দম্পতি জানান, হাসপাতালে এক্সরে মেশিন ভাল থাকলেও তাদেরকে বাইরে থেকে ৩৫০ টাকায় এক্সরে করাতে হয়েছে। ইসিজি করাতে হয়েছে ৩৫০ টাকায়। নিয়মিত চিকিৎসকের দেখা পায়না রোগিরা। সকল ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ৭০ বছর বয়সী প্রফুল্ল চন্দ্র মিত্র জানালেন, লেট্রিন ব্যবহার করা যায় না। নার্স-আয়া কিংবা ব্রাদার এদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের এন্তার অভিযোগ। মোট কথা হাসপাতালটিতে নেই কোন প্রশাসন।

 

কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’র আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ এইচ মাহবুব আলম জানান, হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও রোগীর জন্য খাবার বরাদ্দ রয়েছে ৩১ জনের। গড়ে এখানে ইনডোরে রোগি ভর্তি থাকছে ৫০/৬০ জন। আর আউটডোরে ১১০ থেকে ১২০ জন।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ লোকমান হাকিম জানান, আমি এনসথেসিয়া কোথাও করি না। আর এনেশথেশিয়ার চিকিৎসক ডাঃ ফরহাদ সাহেব একটি কোর্স সম্পন্নের জন্য গেছেন, তাই অপাতত সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে।