চরাঞ্চলে শিশু শিক্ষা ভোগান্তি দিনে দুই বার ভেজে চরাঞ্চলের শিশুরা

2

কামরুল হাসান, রাঙ্গাবালী ঃ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে স্কুল না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু শিক্ষার্থীরা। এলাকায় স্কুল না থাকায় পাশ্ববর্তী এলাকায় গিয়ে লেখাপড়া করছে তারা। স্কুল না থাকা কিংবা যোগাযোগের দূরাবস্তার কারণে লেখাপড়া বন্ধ করে বাবা-মায়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরেছে অনেকে।

 

সরেজমিনে উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চরইমারশনে গিয়ে দেখা গেছে, তোফায়েল কাজীর ছেলে সাইমুন ইসলাম। পাঁচ বছর বয়সের সাইমুন লেখাপড়া করে প্রথম শ্রেণীতে। সাইমুনের গ্রামে কোন স্কুল নেই। তাই বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে ছোটবাইশদিয়া গ্রামে গিয়ে লেখাপড়া করেন । ছোটবাইশদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র সে। খেয়া নৌকায় উত্তাল দারচিরা নদী পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। জোয়ারের সময় হাটু কিংবা কোমর পানিতে ভিজে স্কুলে যায়। আবার ফেরার পথে নদীতে তখন ভাটা থাকে, এসময় কাদাপানিতে ভিজতে হয়। যোগাযোগের এই দূরাবস্তার কারণে কখনো আবার স্কুলে যাওয়া হয় না তার। এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে সাইমুনের লেখাপড়া।

 

জানা গেছে, উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চরইমারশন ও চরতোজাম্মেলে গ্রামে প্রায় দুই হাজার লোকের বসবাস। এরমধ্যে শিশু-কিশোর রয়েছে পাঁচ শতাধিক। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অধিকাংশ শিশু-কিশোর লেখাপড়া না করে বাবা মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজে ঝুকে পড়েছে। বিশেষ করে চরের মেয়েরা লেখাপড়া মধ্যে না থাকায় বাবা-মা সংসারের বোঝা ভেবে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। একারণে অপ্রতিরোধ্য বাল্যবিয়ের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে।

এছাড়া স্কুল না থাকায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে রাঙ্গাবালীর চরমাদারবুনিয়া, চরকাশেম এবং গঙ্গিপাড়ার তিন থেকে চার হাজার ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখতে পারছে না। নিজ এলাকায় স্কুল না থাকায় ৫-৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে লেখাপড়া শিখছে এসব এলাকার ছেলে মেয়েরা। এমনকি উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে কোমলমতি ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে।

ছোটবাইশদিয়ার চরইমারশনের বাসিন্দা বেল্লাল মিয়ার ছেলে ছোটবাইশদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র রাজিব হোসেন বলেন, ‘আমাগো গ্রামে স্কুল নাই। প্রতিদিন নৌকায় কইরা স্কুলে যাই। খালে তুফান তাহে ইসকুলে যাইতে বুক কাইপ্পা উডে। মাঝে মাঝে স্কুলে যাই না। আমাগো এলাকায় স্কুল থাকলে প্রতিদিনই স্কুলে যামু।’

 

ছোটবাইশদিয়ার চরইমারশন গ্রামের জুয়েল প্যাদা বলেন, ‘আমার মেয়ে জুই আক্তার প্রথম শ্রেণীতে লেখাপড়া করে। গ্রামে স্কুল নাই তাই ছোটবাইশদিয়া স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করে। ছোট শিশু জুই নদী দেখলে ভয় পায়। তাই মাঝে মাঝে স্কুলে যায় না। যখন স্কুলে যায় তখন ভিজে যায়। আবার যখন ফিরে তখনও ভিজতে হয়। গ্রামে যদি স্কুল থাকতো তাহলে এতো ভোগান্তির শিকার হতে হতো না।’

 

ছোটবাইশদিয়া নয়াভাংগুনি ৭ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান হান্নান বলেন, ‘চরতোজাম্মেলে স্কুল না থাকায় ছেলে মেয়েরা ৪-৫ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। বর্ষার সময় স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয় তাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অনেক ছেলে মেয়ে পড়া লেখা করছে না। এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন।’

 

ছোটবাইশদিয়ার কোড়ালিয়া ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘চরইমারশনের শিশুরা কষ্ট করে লেখাপড়া করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিশুদের কষ্ট দূর করতে চরইমারশন- কোড়ালিয়া খেয়াঘাটের ওখানে একটি ব্রিজ দরকার। আর ব্রিজটি দিলে চরইমারশনে শিক্ষার হার বেরে যাবে।’

এব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম সগির বলেন, ‘যেসব এলাকায় স্কুলে নেই ওইসব এলাকার তালিকা করেছি। চরমাদারবুনিয়া, চরকাশেমসহ ৭টি এলাকায় সরকারি স্কুল করার জন্য একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’##