জরুরী পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন গ্রোয়েন বাঁধই রক্ষা করতে পারে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটাকে

0

বিশেষ প্রতিনিধি,কুয়াকাটা ঃ বর্ষায় বঙ্গোপসাগরে ঢেউয়ের ঝাপটা এবং প্রবল ¯্রােতে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় গ্রোয়েন বাঁধই যুগপোযোগী ব্যবস্থা হতে পারে বলে এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের। মৌসুমী বালুক্ষয় রোধ ও ভাঙ্গনের কবল থেকে কুয়াকাটা সৈকতকে বাঁচাতে এ বাঁধ সমুদ্রের ¯্রােতধারা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। সেই সাথে সৈকতে পলি জমে বিস্তৃর্ণ বেলাভূমি তৈরীতে সহায়ক হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন প্রফেসর আ ক ম মোস্তফা জামান জানান, কুয়াকাটার মত সমুদ্র সৈকত স্থায়ীভাবে রক্ষায় গ্রোয়েন বাঁধই একমাত্র ভরসা। এটি এক ধরনের স্পেশাল টার্ম হিসেবেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, গ্রোয়েন বাঁধই পারে সমুদ্রের স্রোতধারাকে পরিবর্তন করতে। এর ফলে সৈকতে বালু ক্ষয় রোধ, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র ও সবুজ বেস্টনী রক্ষা করে বিস্তৃর্ণ বেলাভূমি তৈরীতে সহয়তা করবে।

 

বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সেইভ দ্যা কোস্টাল পিপলস (স্কোপ) এর নির্বাহী পরিচালক এনায়েত হোসেন শিবলু জানান, কুয়াকাটা বিশ্বের অন্যতম সাগর সৈকত। এটিকে রক্ষায় বৃহৎ পরিকল্পনা নিতে হবে সরকারকে। বিশ্বের অনেক সমুদ্র সৈকত টিকিয়ে রাখতে গ্রোয়েন বাঁধসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার মতে কুয়াকাটা সৈকতের নিকটে ভৌগলিক কারণে বঙ্গোপসাগর ও আন্ধারমানিক নদীর মোহনা মিলিত হওয়ায় প্রতিবছর বর্ষায় ভাঙ্গনের তীব্রতা দেখা দেয়। এটি রোধে আন্ধারমানিক নদী শাসন ও সমুদ্রের স্্েরাতধারা পরিবর্তন করা হলেই কেবল কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা পেতে পারে। সেটি গ্রোয়েন বাঁধ দিয়েই সম্ভব।

 

এদিকে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সৈকতকে রক্ষা প্রকল্প ১০ বছরেও বাস্তবায়ন হয় নি। ফলে পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও এখানকার ঐতিহাসিক এবং আধুনিকভাবে গড়ে ওঠা মূল্যবান স্থাপনা, পর্যটকদের আকৃষ্ট করার স্পটগুলো সাগরের ভাঙ্গনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার জোগার হয়েছে।

 

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে আন্ধারমানিক মোহনা এবং পূর্বদিকে রয়েছে রামনাবাদ মোহনা। দুই মোহনার মধ্যে ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে আন্ধারমানিক মোহনার একাধিক পয়েন্টে। গত কয়েক বছর ধরে এর ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করায় হুমকির মুখে পড়ে দীর্ঘ ১৮ কিঃ মিঃ সৈকত ও বেড়িবাঁধ। বিনিয়োগকারীদের মোটা অংকের বিনিয়োগ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র সবুজ বেস্টনীও পড়েছে হুমকিতে। ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সৈকতের মাঝিবাড়ী পয়েন্ট, লেম্বুরচর, কম্পিউটার সেন্টার, ইসলামপুর দাখিল মাদরাসা এবং তার অদূরবর্তী নদীভাঙ্গনের শিকার বিপিনপুর, মনোহরপুর, পুরান মহিপুর, হাজীপুর, নিজশিববাড়িয়া, খ্রীস্টান পল্লীর সদরপুর, লালুয়ার চারিপাড়া এলাকা। এসব জায়গায় নতুন করে স্থাপনা তৈরীতে আগ্রহ দেখাচ্ছে স্থানীয় বাসীন্দা ও বিনিয়োগকারীরা।

 

পাউবোর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকল্প প্রতিবেদন প্রস্তাবনায় ৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা চেয়ে বাংলাদেশ পানিউন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ অঞ্চল জোন বরিশালের খেপুপাড়া পাউবো উপ-বিভাগীয় কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়। সে সময় সৈকতের বেলাভূমের ক্ষয়রোধ ঠেকাতে সিসি ব্লকের প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও সে প্রকল্পটিও আজও অনুমোদন হয়নি। গত কয়েক বছরে ৩ কিঃমিঃ সৈকত এবং ২০ কিঃমিঃ বেড়িবাঁধ সাগরগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়।

 

কুয়াকাটায় অন্যতম বিনিয়োগকারী ওশান গ্রুপের এমডি ড. খন্দকার আলী আজম জানান, আন্ধারমানিক মোহনার স্রোতধারা পরিবর্তনে পানির গতিপথ পরিবর্তন করতে পারলেই কুয়াকাটা সৈকতের বালু ক্ষয় ও বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এর জন্য প্রয়োজন যুগপোযোগী গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণ। এ বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক বালু ক্ষয়ের ফলে সৈকতের দর্শনীয় স্থানের সবুজ বনায়ন জাতীয় উদ্যানের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বছর দু’য়েক আগে সৈকতের লাগোয়া এলজিইডির বাংলো কাম বায়ো গ্যাস প্লান্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। সৈকতের বালু ক্ষয় রোধে ও বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতে অপরিকল্পিত ভাবে ব্লক দিয়েও প্রতিরোধ করা যায়নি।

 

অপরদিকে প্রতিবছর কুয়াকাটার রক্ষা বাঁধ ভাঙন প্রতিরোধে কোটি-কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া লাগতো না এবং গ্রোয়েন বাঁধ হলে পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিণত হতো। পাশাপাশি এ খাতে সরকার প্রতিবছর প্রচুর পরিমানে রাজস্ব আদায় করতে পারত বলে বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামতে জানিয়েছেন।

 

দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, এক সময় চট্টগ্রামের কর্ণফুলি মোহনার নৌবাহিনীর ফরোয়ার্ড বেইস ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। এরপর ভাঙ্গন রোধে কর্ণফুলি স্রোতের গতি পরিবর্তনে ভোল্ডার ড্যাম তৈরি করা হয়। যার ফলে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পায়। আজ সেখানে নয়নাভিরাম পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত হিসেবে দেশি বিদেশী পর্যটকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

কুয়কাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’র সাধারন সম্পাদক মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটা সৈকত দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙ্গছে। প্রতিরোধে সরকারও থেমে নেই। ফি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় ব্লক ফেলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিলেও তা উল্লেখযোগ্য কোন কাজে আসছে না।

 

কুয়াকাটা ইনভেস্টর্স ফোরামের মুখপাত্র ও রোটারি ক্লাব অব কুয়াকাটা বীচ’র সেক্রেটারী হাসনুল ইকবাল বলেন, এরই মধ্যে সৈকতের লাগোয়া এলজিইডির বাংলো কাম বায়ো গ্যাসপ্লান্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। সৈকতের বালু ক্ষয় রোধে ও বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পেতে অপরিকল্পিত ভাবে ব্লক দিয়েও প্রতিরোধ হয় নি।

 

স্থানীয় সমাজ উন্নয়ন কর্মী ও ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) লতাচাপলী ইউনিয়ন টিম লিডার মো. শফিকুল আলম বলেন, আন্ধারমানিক মোহনার মূল স্রোত এসে কুয়াকাটার বেলাভূমিতে আঘাত হানায় সৈকতে বালু ক্ষয় ও বেড়িবাঁধে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। আন্ধার মানিক মোহনার জিরো লেভেল পানি থেকে ৩-৪ ফুট উচ্চতার লেম্বুর চর এলাকায় ৫ থেকে ৬ কিঃমিঃ উচ্চতার একটি গ্রোয়েন বাঁধ হওয়া এখন সময়ের দাবী। এ বাঁধটি তৈরী হলে কুয়াকাটায় ভিন্নতর একটি পর্যটন জোন তৈরী হবে এবং পর্যটকদের সেটি ব্যাপক সমাদৃত হবে। পাশাপাশি সরকার এ খাতে প্রতিবছর প্রচুর পরিমানে রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে বলেও সিপিপি টিম লিডার শফিকুল আলম মনে করেন।

 

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশ্রাফ জামান বলেন, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় পাউবোর মাধ্যমে ৫২ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। তবে গ্রোয়েন বাঁধের মত এমন বৃহৎ কোন প্রজেক্ট করা যায় কিনা তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে।

 

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকার বলেন, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় মহাপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মাস্টার প্ল¬ান অনুযায়ী কুয়াকাটার সব উন্নয়ন করা হবে। গ্রোয়েন বাঁধ নির্মান করা সম্ভব কিনা এ জন্য বিশেষজ্ঞদের সার্ভে করা প্রয়োজন।##