জলিল’র জীবন-জীবিকা

7

জাহাঙ্গীর হোসেন, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার গোসিংগা গ্রামে বাসিন্দা। আবদুল হক মুনসীর বড়ো ছেলে আবদুল জলিল। গাছের চাপায় শরীরের প্রধান মেরুদন্ডের কোমরের অংশ ভেঙ্গে গেছে। দাড়াতে পারছে না। হাটুর নিচের পায়ের বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ক্রমান্নয়ে পা দুটি চিকন হয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী লিপির কোলে চড়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হচ্ছে ত্রিশর্ধো বয়সী যুবক আবদুল জলিল এর। ৫ সদস্য পরিবারের সংসার চালাতে গিয়ে স্ত্রি/সন্তানের সাহার্য্যে হুইল চেয়ার বসে উপজেলা সদর ও বন্দরে ভিক্ষা করছে।

গত দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালে মার্চ (রমজান) মাস। শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে টমটম থেকে গাছের একটি খন্ড জলিলের শরীরে ওপর পড়ে। তাৎক্ষনিত মাটিতে লুটিয়ে পড়লে গুরুত্তর অবস্থায় তাকে প্রথম বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিলে কতর্ব্যরত ডাক্তার বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পাঠান। ডা: মোহাম্মাদ শিহাব উদ্দিন শিহাব অধীনে ৫ দিন চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থা অরো অবনতি দেখা দিলে ঢাকাস্থ পঙ্গু হাসপাতালে প্রেরন করে থাকে। সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসা নেয়ার পর জলিলের শারীরিক কোনো উন্নতি না হলে ঢাকাস্থ মডিউল হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় অপারেশন করা হয়। কিন্তু কোনো রকম সুস্থ হলেও জলিল আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি।

গাছের চাপায় আবদুল জলিল শারীরিক ও আর্থিক ভাবে নি:স্বয় হয়ে পড়েছে। তার চিকিৎসার ব্যয় হয়েছে ৪ লক্ষাধিক টাকা। একজন বর্গা চাষী জলিলকে আত্বীয় স্বজনের দেয়া ধার এবং এনজিও ঋন নিয়ে এ ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। তবুও জলিলের শারীরিক ভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেতে পারেনি। মাঝ বয়সী জলিল জীবনে আর হাটতে পারবে না। দাড়াতে পারবে না। অন্যের ওপর র্নিভর করে জীবন চলতে হবে। নিয়তের কি খেলা, এটাই যেন তার মনে বারবার দাগ কাটছে। পিছনের কথা মনে করে বারবার হু হু করে কেদে উঠেছে। প্রতিবেশী শান্তনা দিলে আবার মানুষিক ভাবে একটু শান্ত হয়।

আবদুল  জলিল বলেন, ছোট সংসার তার। পেশায় একজন বর্গাচাষী। দুটি হালের গরু নিয়ে অন্যের জমি চাষাবাদ করতেন। বিয়ে হয়ে বীরপাশা গ্রামের লিপি বেগমের সাথে। সংসার সুখী ছিল। এর মধ্যে ৩ টি সন্তান বাবা মা হয়েছেন। স্বপ্ন ছিল সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলবেন।

দুর্যোগে শিকারে কাহিনী সর্ম্পকে বলেন, পরিবার বাড়তি আয়ের জন্য একই গ্রামের ব্যবসায়ী সানু মৃধার গাছ কাটার জন্য মদনপুরা ঠাকুরবাড়ীতে কাজ করতে ছিলেন। রমজান মাস ছিল। এ সময় জলিল রোজাও রেখেছেন। ইফতারি সময় ঘনিয়ে আসছিল। কাজের একটু তারাছিল যেন। গাছ টম টম ওপর উঠার সময় মেহগুনি গাছের একটি খন্ড গড়িয়ে তার শরীরে উপর পড়ে। তাৎক্ষনিক ভাবে তার জীবন জীবন তছনছ করে দেয়। বর্তমানে কোনো কাজ করতে পারে না। হাটতে পারছে না। স্ত্রী লিপির কোলে চড়ে হুইল চেয়ারে উঠানামা এবং প্রাকৃতিক কাজসহ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে সায়েম ৭ম শ্রেনীতে, ২য় ছেলে সিয়াম ২য়শ্রেনী পড়াশেনা করেন। ছোট মেয়ে মরিয়াম ২ বছর বয়স। ৩ সন্তান ১ স্ত্রী ৫ সদস্য পরিবারের সংসার খরচ মিটাতে ভিক্ষা করছে। হুইল চেয়ারে বসিয়ে মেঝো ছেলে কিংবা স্ত্রী লিপি নিয়ে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন বন্দরে ভিক্ষা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি শুক্রবার ভিক্ষা করতে বের হয়ে থাকেন। শুক্রবার দিন ভিক্ষা করে যা পায় তা দিয়ে পুরা সপ্তাহ কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করেন। কারন ছেলে লেখাপড়া করার কারনে অন্যদিন বের হতে পারেনি।জলিল আবও বলেন, বরিশালাস্থ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিআরপি।ওই সংস্থার স্বরনাপন্ন হলে ১ মাসের মুদি প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকি। সংস্থাটি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে থাকে। এ প্রশিক্ষনকালীন দৈনিক ৮৫ টা সম্মানী দিতেন। বাউফল থেকে বরিশাল গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে ১ সন্তান এবং স্ত্রীসহ তিনজনের খরচ চালিয়ে প্রশিক্ষন গ্রহন ব্যয়বহুল কষ্টকর হয়েছিল। এ ব্যয়বহুল মেটাতে গিয়ে বরিশাল সদরে শুক্রবার দিন ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে আতœকর্মসংস্থান জন্য কিছু মুলধন প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রশিক্ষনের ছয়মাস অতিবাহিত হলেও  সিআরপি সংস্থা আমার খোজ নেয়নি। বছর এক পূর্বে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত হুইল চেয়ারটি নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে চলাচল করতে আরো কষ্ট হচ্ছে। অর্থের অভাবে আরেকটি হুইল চেয়ার ক্রয় করতে পারছি না।

এ সময় জলিলের স্ত্রী লিপি বেগম বারবার চোখের পানি মুছতে মুছতে  দু:খের সাথে বলে, আমার স্বামী আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। আমার সুখী সংসার ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে। পাল্টে গেল তার জীবন ও জীবিকার ধরন। স্বামী আজ ভিক্ষার জন্য অন্যের কাছে হাত বাড়াচ্ছে। ভিক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না। প্রত্যেক লোকের আতœ সম্মানে থাকে। আমার বুকের ধন সন্তান দুটি লেখাপড়া করছে। আমি নিজে মাধ্যমিক বিদ্যালয় সপ্তম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। আমার সাথে সহপাঠীরা অনেকেই চাকুরী করেছে। নিয়তির কি খেলা। জীবনে কি অপরাধ করেছি। ছোট সময় মাকে হারিয়েছি। অনেক কিছু বুঝার আগেই অল্প বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে। জীবনের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই স্বামীকে নিয়ে আজ ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছি।

এ সময় বিত্তশালীর দৃষ্টি আকর্ষন করে পঙ্গু লিপি বেগম বলেন, দেশে অনেক ধনবান দানশীল ব্যক্তি আছে। যারা ঢাকা শহরে কিংবা বিদেশে চাকুরী করে থাকেন। দৈনিক অনেক টাকা পয়সাই উপার্জন ও খরচ করেন। তাদের মধ্যে থেকে ২/৩ জন দানশীল বন্ধু মিলে আমাদের অসহায় সংসারের প্রতি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। ওইসব ধনবান দানশীল বন্ধুর আর্থিক সাহার্য নিয়ে আমাদের ৫ সদস্য পরিবারে আজীবনের আহারের ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। কে ও আমার পঙ্গু স্বামীর জন্য একটি হুইল চেয়ার কিংবা ব্যবসার জন্য কিছু আর্থিক সাহার্য্য ব্যবস্থা করে দিলে তাদের প্রতি আমাদের সব সময় দোয়া এবং আজীবনের কৃতজ্ঞতা থাকবে।

জলিল তার ইচ্ছে সর্ম্পকে বলেন, ভিক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। ছেলে দুটি লেখাপড়া করছে। তাদের সহপাঠী স্যারদের কাছে পেশার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেছে।ভিক্ষা বৃত্তি ছেড়ে দিয়ে চা ও মুদি ব্যবসা করার ইচ্ছে। মূলধনের অভাবে এ ব্যবসা শুরু করতে পারছি না। এর সাথে সংসারে যদি দুধের ১টি গাভী গরু থাকত। গাভী গরুটি পালন করে স্ত্রী লিপি একটু বাড়তি উপার্জন করতেন। যা অসহায় সংসার ছেলে লেখাপড়ার খরচের সহায়ক হতো।