ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা আমতলীতে অর্ধশতাধিক সরকারী ভবন ঝুঁকিপূর্ন সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেই

6

 

কে এম সোহেল, আমতলী প্রতিনিধিঃ আমতলী উপজেলায় অর্ধশতাধিক সরকারী ভবন ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসকল ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করাসহ স্ত্রী পরিবার পরিজন নিয়ে আবাসিক ভবন গুলোতে বসবাস করছেন। এর মধ্যে ১৩ টি ভবন সম্পূর্ন পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়েছে আরো ৫ থেকে ৩৫ বছর আগে। ভবনগুলো জরাজীর্ন হলেও সরকারী ভাবে সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরেজমিন ঘুরে এবং আমতলী উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের আগে এবং পরে অফিসের জন্য ৭০ থেকে ৮০টি ভবন নির্মান করা হয়। ভবনগুলো নির্মানের পর আর কোন সংস্কার না করায় জরাজীর্ন  হয়ে পড়ে। জরাজীর্ন ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে আমতলী সরকারী কলেজের পেছনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র জন্য দ্বিতল অফিস ভবন, বীজাগার, মেশিন রাখার ঘড় ও ২টি আবাসিকসহ মোট ৫টি ভবন নির্মান করা হয়। সংস্কারের অভাবে ৫টি ভবনই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আরো ৩০ বছর আগে পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়। তার পরেও ঝুঁকি নিয়ে কোন রকম জোরাতালি দিয়ে ১টিতে কৃষি রেডিও অন্যটিতে একটি বেসরকারী সংস্থার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। বাকী ৩টি ভবন সংস্কারের অভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হওয়ায় দরজা জানালার মূল্যবান কাঠ, টিন কতৃপক্ষের উদাসীনতায় চুরি হয়ে গেছে।

পাকিস্তান সরকারের আমলে থানা ভবনের  সন্নিকটে নির্মিত সাবরেজিস্টার অফিসের জন্য নির্মিত দ্বিতল ভবনটি সংস্কারের অভাবে ছাদের পলেস্তারর খসে পড়ে রড বেড়িয়ে যায়। বর্ষার দিনে ছাদ চুয়ে পানি পরে। দরজা জানালা খুলে পড়ে যাওয়ায় ভবনটি ব্যবহারের সম্পূর্ন  অনুপযোগী হওয়ায় প্রায় ৫ বছর পূর্বে পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়। বর্তমানে পাশের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে এ অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা অফিস করছেন।

১৯৬৮ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য বর্তমান পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে  অফিস এবং আবাসিকের জন্য কমপক্ষে  ৯ টি ভবন নির্মান করা হয়। সংস্কারের অভাবে ৬ টি ভবন সম্পূর্ন ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়েছে।

এরশাদ সরকারের সময় উপজেলা পরিষদের কম্পাউন্ডের মধ্যে  আনসার বিডিপি, মহিলা বিষয়ক, সমাজসেবা অফিসের জন্য আধাপাকা টিন সেডের ভবন নির্মান করা হয়। এসকল ভবন দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না করায় টিনে মরিচা পড়ে ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় বর্ষার দিনে পানি পড়ে। ফলে ওই সকল অফিসের অনেক মূল্যবান কাগজপত্র ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া দেয়ালে ফাটল ধরে পলেস্তারার খসে পড়ছে। এই ভবনের মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জেসমিন আখতার জানান, বর্ষার দিনে অফিসে বসা জায়না সব জায়গা দিয়ে পানি পড়ে। একই অবস্থা কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত দ্বিতল ভবনটির। এখানে  নীচ তলায় রয়েছে সোনালী ব্যাংক লি:, সমবায় অফিস, উপজেলা পরিষদের হল রুম, দোতলায় রয়েছে যুব উন্নয়ন অফিস, পরিসংখ্যান অফিস, খাদ্য বিভাগ, হিসাব রক্ষন অফিস ও  ভাইস চেয়ারম্যানের জন্য ১ টি অফিস। এ ভবনটি অনেক পুরানো হওয়ায় প্রায়ই ছাদের পলেস্তার খসে পরে।  দেয়ালের অনেক জায়গায় ফাটল ধরায় কর্মকর্তারা ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন। সমবায় কর্মকর্তা আজাদুর রহমান জানান, দিনের মধ্যে দু একবার চেয়ার সরাতে হয় কেননা প্রায়ই ছাদের পলেস্তারার খসে পড়ে। হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, সারাদিন ভয়ের মধ্যে দিয়ে অফিস করি। কেননা ভবনটি এতো পুরানো যে কখন ভেঙ্গে পড়ে তাই নিয়ে দুচিন্তায় থাকি। এই ভবনের একাংশে রয়েছে উপজেলা পরিষদের হল রুম তারও একই অবস্থা। অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে। ছাদের লোহার রড বেড়িয়ে গেছে। দরজা জানালা অনেক পুরানো হওয়ায় ঠিকমতে আটকানো জায়না।

কৃষি কর্মকর্তা ও বন বিভাগের জন্য রয়েছে ২টি টিন সিডের অফিস। অফিস ২টি খুবই জরাজীর্ন।  ২০০৭ সালে সিডরের সময় অফিস দুটির টিন উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পর কোন রকম জোরাতালি দিয়ে সেখানে অফিস করছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। কৃষি অফিসের একটি পাকা ভবন থাকলেও তা সংস্কারের অভাবে সম্পূর্ন ব্যবহারের অনেুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এমইউ বালক মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রয়েছে পাকিস্থান আমলে নির্মিত উপজেলা ভূমি অফিস। এ অফিসটি এতই জরাজীর্ন যে বর্ষাকালে পানি পড়ার কারনে কোন কর্মকর্তা কর্মচারী এখানে বসে ঠিকমত অফিস করতে পারে না। তার পর রয়েছে জায়গা সংকট। ছোট্ট পরিশরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ ৭ থেকে ৮ জন কর্মচারীদের এখানে  বসে  অফিস করতে হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজমুল আলম বলেন, ভূমি অফিসে নাগরিকের কাগজ পত্র অনেক বেশী এবং খুব মূল্যবান। তাছাড়া উপজেলার মধ্যে একটি জনগুরুত্ব পূর্ন অফিস হওয়া সত্বেও এর বেহাল দশা সবচেয়ে অনেক বেশী। পাশেই রয়েছে টিন সেডের ইউনিয়ন ভূমি অফিস তারও একই অবস্থা।

টিএন্ডটি সড়কে রয়েছে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের দ্বিতলা ১টি ভবন। এরশাদ সরকারের আমলে নির্মিত ভবনটি খুবই জরাজীর্ন। সংস্কারের অভাবে ভবনের কার্নিষ সহ ছাদের অনেক জায়গা খসে পড়েছে। বর্ষাকালে ভবনটির ছাদ চুয়ে পানি পড়ে। এছাড়া একই সড়কে অবস্থিত আমতলী সদর ইউনিয়নের ফেমিলি ওয়েল ফেয়ার সেন্টারটিরও একই অবস্থা।

উপজেলা পরিষদের কম্পাউন্ডে রয়েছে ইউএনওসহ কর্মকর্তাদের  জন্য ৯টি আবাসিক ভবন। এর মধ্যে ১টি টিন সেডের এবং বাকী ৭টি দ্বিতলা ভবন। দ্বিতলা ভবনগুলো এতোই পুরানো এবং জরাজীর্ন যে বর্ষকালে  এ ভবনগুলোর ছাদ চুয়ে পানি পরে। অনেক ভবনের দেয়ালের পলেস্তারার খসে পড়েছে। এ ভবনে স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকার মত কোন পরিবেশ নেই। তাছাড়া অনেক ভবনের দরজা জানালা নেই।  দরজা জানালার লোহা খুলে গিয়ে পাল্লা ঝুলে আছে। খুলে যাওয়া এসকল দরজা জানালা  রশি দিয়ে বেঁধে   রাখা হয়েছে।  বিআরডিবি অফিসের সামনে কর্মচারীদের জন্য ১টি এবং ব্যাচেলরদের জন্য ১টি টিন সেডের ডরমেটরি রয়েছে। এগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। টিনে মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে যাওয়া বর্ষাকালে পানি পরে। ভবন ২টির দরজা জানালা ভেঙ্গে গেছে, রান্না ঘড়, বাথ রুম ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ায় এখন আর সেখানে কেউ থাকতে চায় না।

আমতলী ডাকবাংলো  সড়কে রয়েছে  পুরাতন হাসপাতালের বৃট্রিস আমলে নির্মিত ১টি, পাকিস্তান আমলে নির্মিত ২টি এবং এরসাদ সরকারের আমলে নির্মিত ৩টি ভবন। ভবনগুলো সংস্কারের অভাবে সম্পূর্ন ব্যাবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ৩টি ভবনে আমতলী হাসপাতালের কর্মচারীরা নিজেরা সংস্কার করে কোন রকম মাথা গোঁজার ঠাই করে নিয়েছেন।

এ ভাবেই বছরের পর বছর সংস্কারের অভাবে উপজেলার ঝুঁকিপূর্ন অর্ধশতাধিক অফিস ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করাসহ আবাসিক ভবনে বসবাস করে আসছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  মো: মুশফিকুর রহমান বলেন, অফিস এবং আবাসিক ভবনগুলো সংস্কারের জন্য উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে জরুরী ভিত্তিতে এগুলো সংস্কারের জন্য আবারো জানানো হবে।