দশমিনার গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থা হুমকির মুখে

7

হাসান সিকদার: প্রতি বছর বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে নতুন বাড়িঘর। অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ আর বুড়াঁগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে চাষযোগ্য ফসলি জমি দিনদিন হ্রাস পাওয়ায় পটুয়াখালীর দশমিনার গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থা হুমকির মুখে ।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারী- বেসরকারী উদ্যেগ থাকলেও দশমিনায় জনবল সংকট,  যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকা হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা আলোর মুখ  দেখছে না। উপজেলার বিশাল জনগোষ্ঠি বসবাস করে, অনুন্নত  যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকায়। যেখানে পৌছায়না জন্ম নিয়ন্ত্রণের  শ্লোগান ”দুটি সন্তানের  বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়”। আজও অজোপাড়াগাঁয়ে বসতিদের মধ্যে ধর্মান্ধ ও কুসংস্কার আষ্টেপৃষ্টে  বেধে  রেখেছে।

উপজেলার চর  বোরহান, চর শাহজালাল ও চর হাদি ৩টি চর এলাকা সরেজমিনে ঘুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অস্বাভাবিক চিত্র পাওয়া গেছে। মুল ভুখন্ড  থেকে বিচ্ছিন্ন এসব চরে প্রায় ১০হাজার ৫শ জন  লোকের বসতি, অপরদিকে প্রতি পরিবারে গড়  লোকসংখ্যা ৭জন। অধিক সন্তন অধিক উপার্জনে বিশ্বাসী চরবাসীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করতে নারাজ। সরকারী- বেসরকারী জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম একেবারেই অনুপস্থিত।  কোন প্রকার হাট-বাজার কিংবা  দোকান না থাকায়, সম্পূর্ণ চিকিৎসা  সেবা  থেকে বঞ্চিত এরা। অপ্রয়োজনীয় গর্ভজাত সন্তান শিকড় পদ্ধতির শিকারে মারা পরে। আধা সচেতন মায়েরা উপজেলায় এসে  গোপনে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ বড়ি বা ইনজেকশন কিনে  নেয় তাও আবার স্বামী বা পরিবারের সদস্যদেরকে না জানিয়ে এসব ব্যবহার করতে হয়।

এ রকম একজন নির্যাতিত নারী হচ্ছে চর  বোরহানের আলম ফকিরের স্ত্রী  ফেরেজা  বেগম (২৭)।তার বিয়ে হয় ১২বছর আগে। বাল্যবিয়ে হলেও  ফেরেজা এখন ৩  মেয়ে ১  ছেলের জননী। তার স্বামী আরও সন্তান নিতে চায় । এ চরের বারেক গাজীর স্ত্রী শাহিনুরের ৬ সন্তান,  হেলেনার ৫ সন্তন, হাসিনার ৪ সন্তান। এদের প্রত্যেকের স্বামী আরও সন্তান নিতে চায়। তাদের ধারনা হচ্ছে  বেশি সন্তান হলে বহির্লাঠিয়ালদের হাত  থেকে ফসল রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি আয়  রোজগার  বেশি হবে। এ চরে  লোকসংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এ চরের শতকরা ৬০জন কৃষক ৩০জন  জেলে ও ১০ জন  লোক নিয়মিত  কোন  পেশায়  নেই।

চরশাহজালালের  লোকসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ জন। এ চরের শতকরা ৭০জন  জেলে, ২৫ জন কৃষক, ১০ জন  লোক নিয়মিত  কোন  পেশায় নেই।পাঁচ সন্তানের জননী চর হাদির  রেহেনা (৩৭) বলেন,  পোলা মাইয়া  ঝে দ্যয়  হে ন্যয়ুইন্না মালিক, বন্দা অয়ুইন্না ওসুদ পত্তরে  খোদায় ব্যারাজী অয়, গুনা অয়। একই চরের মাজেদা বিবি ৬ সন্তানের জননী। তার  ছেলে নাই একটিও। তাই তিনি  ছেলে না হওয়া পর্যন্ত যত সন্তান নিতে হয়, তত বার নিবেন। এ চরের ভূমিহীন কৃষক  নেতা আমির আলি বলেন, বিনা টাহার বড়ি আনলে বুঝাইয়া কইয়া দ্যাকতে পারি। ৪ শতাধিক পরিবারে ৩ হাজার ৫জন  লোক। এ চরের বসতিদের কর্মাবস্থা চর শাহজালালের মতোই।

অপরদিকে উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন রণগোপালদী, আলীপুর,  বেতাগী সানকিপুর, দশমিনা, বহরমপুর ও বাঁশবাড়িয়ায় ৫২টি  মৌজা বা ৫১টি গ্রামে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব অবহেলাসহ অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার কারনে জনসংখ্যা বিষ্ফোরণ ঘটাচ্ছে।জনসংখ্যার বিভিন্ন জরিপ সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে উপজেলায় ১লাখ ১৭ হাজার ৩৭জন, ২০১০ সালে ২৬হাজার ১৯৭জন বৃদ্ধি  পেয়ে দাড়িয়েছে ১লাখ ৪৩হাজার ২৩৪জনে যা এ উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে খন্ডিত করে দূর্বল করে  দেয়।

জনসংখ্যার এ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের  মেডিকেল অফিসার ডাঃ  মোঃ জাকির  হোসেনের সাথে আলাপ কালে তিনি জানায়, দশমিনার মূল ভূখন্ডের জনসংখ্যা প্রায় নিয়ন্ত্রিত আগের মত  লোক বাড়ছেনা মানুষ সচেতন হয়েছে তবে দুর্গম চরাঞ্চলে, যানবাহন না থাকা, নিরপত্তার অভাব, জনবল সংকটের কারণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা। তাছাড়া ওই সব চরে  লোকজন অশিক্ষিত ও ধর্মান্ধর দরুন নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্ট সাধ্য।জরিপ সূত্রে জানা যায়, ৩৫১.৪৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উপজেলায়  মোট স্থলভাগ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৯৯  হেক্টর, আবাদ  যোগ্য ভূমি ২লাখ ৩০ হাজার ৭১০  হেক্টর, অনাবাদি ভূমির পরিমান ১লাখ ২১ হাজার ১৮৯  হেক্টর।

অপরদিকে কৃষি ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ২৫হাজার ৭২৫  হেক্টর উর্বর ও উন্নত জমি চাষাবাদ করা হয় এবং প্রায় ৮হাজার ৫০একর জমি বাড়ী, রাস্তা ও পুকুর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতি বছরে বৃদ্ধি পাওয়া জনগোষ্ঠীর জন্যে উন্নত জমি বাছাই করে নতুন বাড়ীঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। অপর দিকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উপজেলার সদর ইউনিয়নসহ বাঁশবাড়িয়া ও রণগোপালদী ইউনিয়নের ১০ হাজার একর উর্বর ও উন্নত চাষযোগ্য ফসলি জমিসহ বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দির বিলীন হয়ে  গেছে। প্রতি বছর প্রায় ৫০-৬০একর ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায় বলে স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের সূত্রে জানা  গেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান দপ্তরের ২০০১সালে রিপোর্টে জানা যায়, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের রণগোপালদী ইউনিয়নে ৪হাজার ৪০২টি, আলীপুরায় ৪হাজার ২৮৮টি,  বেতাগী সানকিপুরে ৪হাজার ১২০টি, দশমিনায় ৫হাজার ৫০৬টি, বহরমপুরে ৪হাজার ৬১৪টি ও বাশঁবাড়ীয়ায় ৪হাজার ৪৮৮টি বাড়িসহ মোট ২৭হাজার ৪১৮টি বাড়ি রয়েছে। ২৩হাজার ৮০১টি বাড়িতে  লোকজন বসবাস করছে। অবশিষ্ট ৩হাজার ৬১৭টি বাড়ি পরিত্যক্ত কিংবা বসবাস উপযোগী হয়ে উঠেনি। স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা জানান, প্রতি বছর ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব বাড়ি রিপোর্টে আসলেও বাড়ীর মালিকরা নতুন বাড়ি বাস উপযোগী করার জন্য বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছের চারা  রোপন করে এবং ২-৩বছর পর নতুন বাড়িতে ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করে।

জরিপ সূত্র আরও প্রকাশ করে, ২০০৮সালের জরিপে বসবাসকারী বাড়ির স্যংখ্যা দড়িয়েছে ২৯হাজার ২৩০টি। মাত্র ৭বছরের ব্যবধানে বসবাসকারী নতুন বাড়ি হয়েছে ৫হাজার ৪২৯টি, যা জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, উন্নত ভূমির ব্যবহার আর গ্রামীণ অর্থনীতির খন্ডায়নের চিত্র তুলে ধরে। কৃষি নির্ভর  এই উপজেলায় ফসলি জমি হারানো ও জমির আংশিক মালিকানা বৃদ্ধির জন্য বড় কৃষক  থেকে সৃষ্টি হচ্ছে মাঝারি কৃষকের, মাঝারি  থেকে প্রান্তিক। প্রান্তিক কৃষক পরিবারে অংশিদারিত্বের কারণে ভিক্ষা বৃত্তিও  চোখে পরার মতো বেড়েছে। এজন্য উপজেলার বিপন্ন গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ  জোরদারের পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন গড়ে  তোলভার প্রয়োজন  বোধ করছেন সামাজবোদ্ধারা।