দশমিনার শতাধিক খালের হদিস নেই

3

দশমিনা প্রতিনিধিঃ পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় সিএস ম্যাপের দেড় শাতাধিক খাল থাকলেও চর্চাম্যাপে কৃষি খাস জমি দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তারা বন্দোবস্ত দিয়ে ভূমি খাদকদের পেট পুড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম খালগুলো দিয়ে নদী কিংবা সাগর থেকে পলি মাটি আসতে না পারায় ফসলি জমি উর্বরতা হারিয়েছে। মানব দেহে ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া উৎপাদন হচ্ছেনা ফসল। ভুক্তভোগী কৃষক ও কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পূর্বতীর ঘেষে নদী। একই নদী দু’নামে পরিচিত। উপজেলা সদর ইউনিয়নের হাজিকান্দা এলাকার উত্তর অংশ তেঁতুলিয়া আর দক্ষিণ রণগোপালদী ইউনিয়ন পর্যন্ত বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর অবস্থান। বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদীর থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপত্তি হওয়া প্রায় দেড় শতাধিক খাল দিয়ে উপকূলীয় দশমিনার ফসলি জমিতে পলি মাটি এসে পড়তো। গ্রাম থেকে গ্রামে ছিল নৌ যোগাযোগ। দশমিনার এই খালগুলো দিয়ে বাউফল উপজেলার কালাইয়া বাজার ও গলাচিপার উলানিয়া বাজারে নৌকা-ট্রলারে মালামাল নিয়ে যাতায়াত করত স্থানীয় মানুষ। কিন্তু সেই খালগুলো মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে এর চিহ্ন নেই। বর্তমানে নৌকা ট্রলার চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ফসলি জমিতে পলি মাটি পড়াব বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাজার, হাজার হেক্টর ফসলি জমি উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ফসল উৎপাদন করতে হলে প্রয়োগ করতে হয় রাসয়নিক সার ও কীটনাশক। যা মানব দেহে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী ও ভূমি খাদকরা নামে বেনামে খাল বন্দোবস্ত নিয়েছে।খালে বাধ দিয়ে মাছ চাষ করছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বাধ ও কালভার্ট নির্মান করায় খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা হলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর শুস্ক মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। ফলে জলাবদ্ধতা ও পানি সংকটে ফসলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মূখীন হতে হচ্ছে কৃষকদের। সরেজমিনে দেখা যায় , উপজেলার প্রান কেন্দ্রে অবস্থিত গার্লস স্কুল সংলগ্ন খালের উপর নব নির্মিত ব্রিজটি কালের স্মৃতি হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। এই খালটি ১৪/১৫ জনে বন্দোবস্ত নিয়ে দখল করে রেখেছে। খালের দুই পাশ কেটে মাটি ভরাট করে চাষযোগ্য জমি তৈরি করেছে। অথচ এ খালটি দিয়ে আগে নৌকা চলাচল করতো। প্রায় দুই হাজার একর জমির পানি উঠানামা করতো। নদী থেকে পলি মাটি পড়ে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতো। এখন কিটনাশক ও সার ছাড়া কোন ফসল উৎপাদান হয় না। বর্ষা হলে কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারেনা। উপজেলার বাশঁবাড়িয়া ইউনিয়নের চর হোসনাবাদ এলাকার খালটি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। এ খাল দিয়ে প্রায় ৫ হাজার একর জমির পানি উঠানামা করে। স্থানীয় লোকজন ঐ বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য মামলা দায়ের করেছে। লক্ষ্মীপুর গ্রামের নিবারন কবিরাজের নামের বিশাল খালটি ১০/১৫ হাত পানি থাকা অবস্থায় বন্দোবস্ত দিয়েছে ভূমি অফিস। বন্দোবস্ত প্রাপ্তরা খালটি ভরাট করে বোরো চাষাবাদ করছে। এই খাল দিয়ে প্রায় ৩ হাজার একর জমির পানি উঠা-নামা করতো। উপজেলা সদরের দক্ষিন আরজবেগী আজগুরিয়া খালটি স্থানীয় প্রভাবশালী ধনাঢ্য কাসেম খা সহ ১০ জনে বন্দোবস্ত নিয়েছে। ঐ খালে শুষ্ক মৌসুমে ১০/১২ হাত পানি থাকে। খালটি দখলকারীরা বাধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করছে। পানি উঠা নামা করতে পারে না। জলাবদ্ধতায় যথাসময় প্রায় ১ হাজার একর জমি চাষাবাদ হয়না। উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের খলিশাখালীর কেয়ার খাল, ইঞ্জিনারায়ন খাল, শিংবাড়ীয়া খাল, রণগোপালদী ইউনিয়নের কাটা খাল। আউলিয়াপুর গ্রামের নাপ্তার খাল, তালতলার হোতা খাল স্থানীয় প্রভাবশালীরা বন্দোবস্ত নিয়েছে। এসব খাল প্রভাবশালীরা দখল নিয়ে ভরাট ও বাধ দিয়েছে। ফলে প্রতি বছর জলাবদ্ধতা ও পানি শূন্যতায় নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর জমির ফসল। বাধ ও অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মানের ফলে বুড়াঁগৌরাঙ্গ তেঁতুলিয়া নদী থেকে পলি মাটি আসতে পারছে না। ফলে  ফসলি জমি দিন দিন উর্বর শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের নিষ্কাশনের খালগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে নদীর পানি উপজেলার ভিতরে প্রবেশ করতে না পাড়ায় নদীর তীর ভাঙ্গনের সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৮ সালে উপজেলার শত শত কৃষক খালের অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবরে একাধিক আবেদন করেন। ওই বছরের ১৯ নভেম্বর উপজেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ১৬৪ টি বন্দোবস্ত কেস বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভূমি খাদকদের করা মামলা আদালতে বিচারাধীন। ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০ এর ৬৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক জেলা কালেক্টর কবুলিয়াতের শর্ত ভঙ্গের কারণ দর্শাইয়া যে কোন বন্দোবস্ত কেস বাতিল করতে পারবেন। সম্প্রতি পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা মুক্ত জলাশয় ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশের সকল খালের অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট মামলা (৩৮৫৫/১৩) দায়ের করেন। এর আদেশের বাস্তবায়ন এবং দেশের সকল প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধান অনুসারে দেশের সকল খাল রক্ষার জন্য নির্দেশনা জারি থাকলেও উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার ভ’মি মোঃ আজহারুল ইসলাম জানান,অবৈধ ভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া খালগুলোর ব্যাপারে আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে॥