দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে সোনারচর

4

কামরুল হাসান, রাঙ্গাবালী ঃ দ্বীপের নাম সোনারচর। সৌন্দর্যের যাবতীয় আয়োজন রয়েছে এ দ্বীপটিতে। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়েছে এ দ্বীপের চারপাশে। সোনারচরের চিকচিক বালিতে যেন ভোরের কোমল সূর্য আলো ছড়ায়। অপরূপ সোনারচর স্বর্ণালী স্বপ্নের মতোই বর্ণিল শোভায় ঘেরা। অন্তত একবার এসে দেখুন দেশের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দ্বীপটিকে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে সোনারচরের অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের কোলজুড়ে বেড়ে ওঠা সোনারচরের আয়তন প্রায় ১০ হাজার একর। উত্তর-দক্ষিণ লম্বালম্বি এ দ্বীপটি দূর থেকে দেখতে ডিমের মতো। পথ দুর্গম হলেও সৌন্দর্যের নিপুণ কারুকাজ সেই দুর্গমতাকে লাঘব করে অনেকখানি। আছে বন-বনানি আর অস্থায়ী পলি। শুধু নেই কোনো অবকাশ যাপনের আয়োজন। সৌন্দর্য পিপাসুদের অনেকেই সোনারচরের রূপ দেখে মুগ্ধ। কিন্তু রাত যাপনের উপায় নেই বলেই সূর্য ডোবার আগে গন্তব্যে ফিরতে বাধ্য হন পর্যটকরা।

 

নামকরণ

সোনারচরে সোনা নেই ঠিকই কিন্তু আছে সোনার রঙে রাঙিত বালি। সূর্যের রশ্মি যখন বালির ওপর পড়ে তখন দূর থেকে মনে হয়, সত্যি সত্যিই সোনারচরের আবির্ভাব হয়েছে এখানে। এভাবে ৩০-এর দশকে জেগে ওঠা অপার সম্ভাবনাময় সৌন্দর্যের দ্বীপটির নাম পাল্টে গিয়ে সোনারচরে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পর শুরু হয় বনায়ন। সোনারচরে রয়েছে ৫ হাজার একরের বিশাল বনভূমি। পটুয়াখালী বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনের পরেই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুবিশাল সমুদ্র সৈকত।

 

দেখা যাবে যত কিছুৃ

এলাকাবাসীর কাছে সোনারচর নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রতীক। সাগরে যখন জোয়ারের জল উথলে ওঠে তখন চাদের আলোয় অন্য এক সৌন্দর্যে রূপ নেয় এই সোনারচর। প্রতিনিয়তই তীরে আছড়ে পড়ছে ছোট-বড় ঢেউ। ঝুরঝুরে বালি গলে পড়ছে লোনা জলে। সবুজ ঘন অরণ্যের নিবিড়তা ছেয়ে আছে চারপাশজুড়ে। মৃদু মৃদু বাতাস আর ঢেউয়ের তালে এই চরের ছোট-ছোট বাঁওড়ে অথবা খালে চলে জেলেদের নৌকাগুলো। বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলেরা। সাগর থেকে আসা খালগুলোতে মাকড়সার মতো অসংখ্য ঠেলা জাল দিয়ে ঠেলছে শিশুরাও।

 

সৈকতে দেখবেন যা

বনাঞ্চলের কাছাকাছি গেলে হয়তো সহজেই চোখ পড়বে বুনো মোষ, হরিণ, শুকর, বানর, মেছো বাঘসহ আরও সব বন্য প্রাণীর ওপর। এসব দেখতে হলে প্রভাতেই বেরিয়ে পড়তে হবে নৌকা নিয়ে। সৈকতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যাবে সূর্যাস্ত কিংবা সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য। চোখে পড়বে নানা ডানা ঝাপটানো নাম না জানা অতিথি পাখির দল। তাদের কিচিরমিচির শব্দে সন্ধ্যার পরিবেশটুকু উপভোগ করা যাবে নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে। বিশেষ করে তরুণদের কথা তো ভাবাই যায় না। দেখতে পাবেন সমুদ্রগামী হাজারো জেলের জীবন সংগ্রাম। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর সবুজ প্রকৃতির এমন নিরিবিলি জায়গা সহজে কোথাও পাওয়া যাবে না। দেখেশুনে প্রবল ইচ্ছা যদি জেগেই যায় তাহলে জমিও কিনতে পারেন সোনারচরের সৌন্দর্য দ্বীপে।

 

যতটুকু সম্ভাবনা

পর্যটন শিল্পে এখন প্যাকেজ ট্যুরের বিষয়টি বেশ পরিচিত। পারিবারিকভাবে তো বটেই। সবাই মিলে একসঙ্গে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াবার মজাও কিন্তু কম নয়। ঢাকা থেকে আসা বেশির ভাগ পর্যটকই এ পটুয়াখালী জেলার অপর পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা এসে ঘুরে চলে যান। কিন্তু রাঙ্গাবালীর সোনারচর, রুপারচর, চরহেয়ারসহ সমুদ্র ফুঁড়ে জেগে ওঠা সবুজ বনাঞ্চলের সন্ধান জানেন না অনেকেই। এসব চর আর সৌন্দর্যের বনাঞ্চলকে পর্যটনমুখী করতে আগে দরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন। প্রথমেই যে কাজটি করা দরকার তা হলো কুয়াকাটা থেকে সেনারচর পর্যন্ত সি-ট্রাকের ব্যবস্থা। একইভাবে রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকেও সি-ট্রাকের ব্যবস্থা করতে হবে। এই দুই পথে সি-ট্রাক চলাচল করলে পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে। পাশাপাশি নিয়মিত সি-ট্রাক চালু হলে এইসব এলাকার লাখো মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অভাবনীয় সূচনা হবে। এজন্য সোনারচরে একটি পন্টুন স্থাপন করা জরুরি। রুপারচর, চরমোন্তাজ, চরআন্ডাসহ পাশের দ্বীপগুলোতে হোটেল, মোটেলসহ রেস্ট হাউস তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসতে পারেন।

 

সোনারচরের লম্বা পথ

দেশের মানচিত্রটি সামনে ধরলে দেখা যাবে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থান করছে সাগরকন্যা হিসেবে খ্যাত পটুয়াখালী। সেখান থেকে দ্বীপরাজ্য রাঙ্গাবালী হয়ে আপনাকে জলযানে পৌঁছাতে হবে সোনারচরে। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে সোনারচরের সঙ্গে রাঙ্গাবালীর ভালো কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। হিসাব করলে রাঙ্গাবালী থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। পথের দূরত্ব বেশি হলেও সৌন্দর্য পিপাসু মনের খোরাক নিভৃতির কারণে দেড় ঘণ্টার পথকে মনে হবে ৩০ মিনিট। কারণ লঞ্চযোগে প্রথমে রাঙ্গাবালী থেকে যেতে হবে চরমোন্তাজ। সেখান থেকে ট্রলারে পাড়ি দিতে হবে বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর মোহনা। সব মিলিয়ে লাগবে আড়াই ঘণ্টা। সোনারচরে কেউ কেউ কটেজ, হোটেল, মোটেল করার চিন্তা-ভাবনা করলেও এখন পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই মন চাইলে বন বিভাগের ডাক বাংলোটিতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আর রাত যাপনের ইচ্ছা হলে সোজা চলে আসতে হবে চরমোন্তাজে। এখানে একাধিক হাটেল, মোটেল রয়েছে। গ্রীষ্মের অশান্ত পরিবেশ কিংবা শীতের শান্ত প্রকৃতিতে কেউ যখন কুয়াকাটায় যান তাদের অনেকেই এ সময় ঘুরে আসেন সোনারচর। আর কুয়াকাটা থেকে স্পিডবোট রিজার্ভ করে সোনারচর যাওয়ার সুব্যবস্থাও রয়েছে।##