পটুয়াখালী চরাঞ্চলের মানুষ ভাসছে জোয়ারের পানিতে

2

জাহাঙ্গীর হোসেনঃ পানিতে ডুইব্বা গ্যাছে এ্যাহন আর ঘরে থাকতে পারি না। আতœীয়র বাড়তে যাই, পানি কোমলে বাড়তে ফিরগা আমু।’ নিজের ঘর-সংসার, ভিটা-মাটি ফেলে থৈথৈ পানি থেকে মুক্তির জন্য বাড়ি ছাড়ছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চর নিমদির মো. কাশেম  ব্যাপারি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তিনি আরো বলেন, ‘আমাগো চরে কোন বেরিবান(বেরিবাঁধ) নাই। প্রেত্যেক বচ্ছর (প্রতিবছর) এই সময় আমরা বাড়ি ঘর ছাইরগা চইলগা যাই। বচ্ছর বচ্ছর আমনেরা আন(আসেন) ছবি তোলেন। একটা বেরি কইরগ্যা দেলে আর ছবি তোলন লাগবে না। তাহেলে আমাগোও আর কষ্ট থাকপে না।’

শুধু কাশেম ব্যাপারীই না। স্ত্রী, সন্তান এবং গবাদিপশু নিয়ে বাড়ি ছাড়ছেন চর ব্যারেটের মো. সাহেব আলী সরদার। তিনি বলেন, ‘আমাগো এই বইন্যা দেইক্যা আমনেরা রিলিপ দেন। আমরা কএ্যাকদিন (কিছুদিন) ফাও খাই। আমাগো কষ্ট তো হ্যাতে (তাতে) যায় না। রিলিপ চাই না, একটা বেরিবান কইরগ্যা দেন।’ চর নিমদির মো. রুবেল গাজী, মো. মজিবর হাওলাদার, মো. বাদল জোমাদ্দার, মো. শফিক হওলাদার ও মো. ফারুক ব্যাপারীকে শুক্রবার  পরিবারের লোকজন নিয়ে উঁচু জমিতে বসবাসরত আতœীয় বাড়িতে চলে যেতে দেখা গেছে। একই অবস্থা ওই ইউনিয়নের চর রায়সাহেব, ব্যারেট, নিমদি, কচুয়া, দিয়ারা কচুয়া, মিয়াজান, ওয়াডেল এলাকারও নিচু ভিটিতে বসবাস করা লোকদের।

স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বেরিবাঁধ না থাকার কারণে বাড়ি ঘরে ডুকে পড়েছে পানি। কেউ ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, কেউবা আবার ঘর-বাড়ি ছাড়ছেন, আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এদিকে ওই ইউনিয়নের চর দিয়ারাকচুয়া, রায়সাহেব ও মিয়াজান এলাকায় এলজিইডির অর্থায়নে বেরিবাঁধ নির্মান হলেও সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন সময় প্রলঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে ওই বেরিবাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট বিধস্ত হলেও তা সংস্কার করায় ওই বেরিবাঁধও এলাকাবাসীর কোন উপকারে আসছে না। ফলে পুরো চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন বর্তমানে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত। ইতিমধ্যে জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে ওই ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পুকুর।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহামুদ জামান বলেন, ‘নদী বেষ্টিত চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের পাশাপাশি, চর মমিনপুর, চরবাসুদেবপাশা এবং চর পাকডাল এলাকার মানুষ জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। ওইসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চাষাবাদ এবং গবাদিপশু রক্ষার্থে দ্রুত বেরিবাঁধ নির্মান ও সংস্কারের ব্যাপারে উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

এদিকে দশমিনা উপজেলার হর হাদি, চর বোরহান ও চর শাহাজালাল, গলাচিপা উপজেলার চরকাজল, চরবিশ্বাস এলাকার নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত মানুষরা জোয়ারের প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ মিটার বেরিবাঁধ ভেঙে দক্ষিন চরমোন্তাজ ও নয়ারচর গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি জীবনযাপন করছে। অনেক পরিবার পানির জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নিজের বাড়ি ঘর ফেলে স্বজনদের বাড়িতে চলে গেছেন। কেউবা আবার পাশের বেরিবাঁধের ওপর ঘর বানিয়ে বসতি গড়েছে। পানিবন্দি ওই দুই গ্রামের লোকজন গবাদি পশু-পাখি নিয়ে রয়েছেন চরম বিপাকে। দক্ষিন চরমোন্তাজ গ্রামের মো. শামীম হাওলাদার বলেন, ‘গরু-বাছুর আল-আইল্লাডি (হাল-হালুটি) আমাগো কৃষকের একটা সম্পদ। বান (বাঁধ) ভাইঙ্গা এ্যাহন গরু বাছুর লইয়া একটা বিপদের মধ্যে আছি।’ বসতঘর ডুবে যাওয়ার কারণে নয়ারচর গ্রামের মো. আলাউদ্দিন বেরিবাঁধের ওপর দুইমাস আগে ঘর বানিয়ে বসতি গড়েছেন। তিনি বলেন, ‘কেমন করমু আমাগো এলাকার বেরি ছুইট্টা গ্যাছে, পানিতে ঘরবাড়ি সব তলাইয়া গ্যাছে। মাইনস্যের (অন্যদের) বাড়ি কয় দিন থাওন যায়। এ্যাহন এই বান্ধের(বাঁধে) উপরেই ঘর বানাইছি।’

চরম দূর্গোগের মধ্যে রয়েছে পানি বন্দি গ্রামগুলোর কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থীরা। ওই বাঁধ বিধস্ত হয়ে ভেসে গেছে প্রায় ৫০টি মাছের ঘের। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির করা কাশেম খার ডোস ঘেরটি প্লাবিত হয়ে প্রায় আট লাখ টাকার পোনা মাছ ভেসে গেছে। ওই সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম শহীদ বলেন, ‘বাঁধ ভাঙনে ঘের মালিকদের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এখন ঘের আর নদী সমান। সামগ্রিক ভাবে এ ক্ষতির পরিমান বছর শেষে ১০ থেকে ১২কোটি টাকা হবে।’

ভেঙে যাওয়া বাঁধ এখনও সংস্কার করা হয়নি। তবে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের সংস্কারের ব্যাপারে বলেন, ‘বিষয়টি উর্ধতণ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বারাদ্ধ পেলে দ্রুত ব সংস্কার করা হবে।