পায়রা সমুদ্র বন্দর সচল রাখতে বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীকে নিরাপদ রাখার দাবি

6

 

অতুল পাল, বাউফল বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান স্থাপনা পায়রা বন্দর। পায়রা বন্দর থেকে রাজধানীসহ দেশের অভ্যন্তরে মালামাল পরিবহনের একমাত্র সহজ ও সংক্ষিপ্ত নৌপথ হচ্ছে বাউফল উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত তেঁতুলিয়া নদী। কিন্তু  প্রায়শ:ই এপথে চলাচলকারী নৌযানে জলদস্যুদের হামলার কারনে নৌপথটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। তাই পায়রা বন্দরকে সচল ও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের চাকা সচল রাখতে বাউফলের তেতুঁলিয়া নদীকে নিরাপদ নৌপথ হিসেবে গড়ে তোলা দরকার বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও ব্যাবসায়িরা মতামত ব্যক্ত করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের উন্নয়নের মূল¯্রােতে সম্পৃক্ত করার লক্ষে ব্যপক পরিকল্পণা হাতে নেন। এরমধ্যে পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপণ অন্যতম প্রধান প্রকল্প। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে “ পায়রা সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩” পাশ করা হয় এবং ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা বন্দরের উদ্বোধন করেন।  দেশি ও বিদেশি একাধিক সংস্থা কর্তৃক জরিপপূর্বক বঙ্গোপসাগরের রামদা চ্যানেলের মধ্যবর্তী পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া এলাকায় দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর “পায়রা সমুদ্র বন্দর” স্থাপণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন এবং বন্দরের জন্য টিয়াখালীর ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করেন। ইতিমধ্যেই বন্দরে পিওএমএমডি কর্তৃক নৌ বাণিজ্য ছাড়পত্র, শুল্কায়ন, ইমিগ্রেশন সার্ভিস, কোয়ারেন্টাইন, শিপ হ্যান্ডলিং, সিএন্ডএফ ও এজেন্সি সার্ভিস, ট্যারিফ নির্ধারণ এবং জাহাজের রাজস্ব ও শুল্ক পরিশোধ সুবিধাসহ নানা সুবিধাসমূহ স্থাপণ করা হয়েছে। অত্যবশ্যকীয় বিভিন্ন স্থাপণা ও জনবল নিয়োগ করে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পায়রা সমুদ্র বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। নৌপথে মালামাল খালাস করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের জন্য দুটি নদী পথের ৭২ নটিক্যাল নৌ পথকে ব্যবহারের জন্য চি‎‎হৃত করা হয়। এর একটি হচ্ছে রামদা নদী হয়ে গলাচিপার বুড়া গৌরাঙ্গ ও আগুনমূখা নদী হয়ে পটুয়াখালীর লোহালিয়া নৌ পথ এবং অপরটি হচ্ছে রামদা নদী হয়ে বাউফল-দশমিনার তেঁতুলিয়া নৌ পথ। কার্যক্রম শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই বুড়া গৌরাঙ্গ ও আগুনমূখাসহ পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীতে অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি, নাব্যতা সংকট ও পটুয়াখালীতে নির্মাণাধিন একটি সেতুর কারণে ওই নৌ পথটি দিয়ে মালামাল পরিবহনকারী লাইটার জাহাজগুলো চলাচলে বিঘœ ঘটে। এরপর থেকেই লাইটার জাহাজগুলো দ্বিতীয় চিহৃত নৌ পথ বাউফল-দশমিনার তেঁতুলিয়া নদী ব্যবহার করে রাজধানীসহ দশের বিভিন্ন অঞ্চলে মামলামাল পরিবহন করে আসছে। সংশ্লিষ্টদের থেকে জানা গেছে, দুরত্ব, সময় ও নদীর নাব্যতা বিবেচনা করে লাইটার জাহাজগুলো এখন বাউফল-দশমিনার তেঁতুলিয়া নদী পথে যাতায়াত করতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে মালামাল খালাস করে লাইটার জাহাজগুলো গলাচিপার পূর্বপাশ দিয়ে মেঘনার অববাহিকা বাউফল-দশমিনার তেঁতুলিয়া নদী হয়ে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলার পাশ দিয়ে সরাসরি মেঘনা নদীতে চলে যায়। একারণে পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দুরত্ব অনেক কম।

কিন্তু তেঁতুলিয়া নদীর বাউফল অংশের প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী পথ জলদস্যুদের কারণে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেঁতুলিয়া নদীর বাউফলের এ অংশে একাধিক লাইটার জাহাজ, কার্গো ও ট্রলার জলদ্যুদের কবলে পড়ে। এরপরেও নৌযানগুলো ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। বাউফলের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বাউফলের কিছু পেশাদার  জলদস্যুদের সাথে পার্শবর্তী ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন ও লালমোহন উপজেলার পেশাদার জলদস্যুদের সম্পৃক্তা রয়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে তারা নৌযানগুলোতে ডাকাতি করে সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়ে যায়। বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ওয়াকিবহাল থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জমাদি ও উচ্চ গতি ও ক্ষমতা সম্পন্ন নৌযান না থাকার দোহাই দিয়ে এরিয়ে যাচ্ছেন। পায়রা সমুদ্র বন্দর ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ ভিত্তিক অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে পটুয়াখালী ও ভোলা প্রশাসনের মধ্যে আন্ত:যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জলদস্যু নির্মূলে প্রযোজনীয় পরিকল্পণা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীকে জলদস্যুমুক্ত রাখা উচিত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা মনে করছেন।

পায়রা সমুদ্র বন্দরের চেয়ারম্যান ক্যাপটেন সাঈদুর রহমান জানান, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পায়রা সমুদ্র বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এ সমুদ্র বন্দর থেকে মালামাল খালাস করে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করার জন্য বাউফলের তেঁতুলিয়া নদী পথই উত্তম। এক্ষেত্রে তেঁতুলিয়া নদীকে নিরাপদ ও জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে নদীর বাউফল-দশমিনা অংশে কোস্ট গার্ডের একটি স্টেশন করার জন্য বিগত ৬ মাস থেকে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে কবে নাগাদ ওই স্টেশন করা হবে সে সম্পর্কে কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ কিছু জানাননি।

নৌ পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আবদুল মোতালেব জানান, তেঁতুলিয়া নদীর বাউফলের অংশকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য কালাইয়াতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ইতিমধ্যেই ওই ফাঁড়িকে একটি পূর্ণাংগ নৌ থানা করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ওখানে নৌ থানা হলে তেঁতুলিয়ার বাউফল-দশমিনার অংশ পূরোপূরি নিরাপত্তার বলয়ে আনা যাবে। এছাড়া ভোলা ও পটুয়াখালীর পুলিশ প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে জলদস্যু নির্মূলে যৌথ অভিযানেরও পরিকল্পণা রয়েছে।

বাউফলের এমপি ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে নৌপথে মালামাল পরিবহনে তেঁতুলিয়া নদীকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যাক্ত করে বলেন, পায়রা সমুদ্র বন্দর আমাদের গর্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে একটি অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা এবং এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য পায়রা সমুদ্র বন্দর আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। পায়রা সমুদ্র বন্দর এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। কোন অপশক্তিই এ অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করতে পারবেনা। তেঁতুলিয়া নদীর বাউফল অংশকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে নদীতে ভাসমান একটি অত্যাধুনিক নৌ থানা স্থাপণ এবং কোস্ট গার্ডের একটি স্থায়ী টহল দল রাখার ব্যপারে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। লাইটার জাহাজগুলো যাত্রাপথে স্বল্প সময়ের জন্য নোঙ্গর করে প্রয়োজনীয় খাদ্য, নিরাপদ পানি ও ওষুধপত্রসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহ করতে পারে সে জন্য বাউফলের কালাইয়া কিংবা চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে টার্মিনাল স্থাপনের ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরফলে পায়রা সমুদ্র বন্দরের আশপাশের উপজেলায়ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং সাধারন মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাবে।

তেঁতুলিঢা নদী সংলগ্ন বাউফল উপজেলার নাজিরপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইব্রাহিম ফারুক, কালাইয়া ইউপি চেয়ারম্যান এসএম ফয়সাল আহমেদ, চন্দ্রদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক, কেশবপুর ইউপি চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন লাভলু, ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আনিচুর রহমান রব এবং দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র কালাইয়া বন্দর ব্যাবসায়ি সমিতির সভাপতি মানিক লাল কুন্ডসহ অনেক জনপ্রতিনিধি ও ব্যাবসায়িরা জানান, তেঁতুলিয়া নদীতে জলদস্যুদের অভয়ারণ্য নির্মূল করতে না পারলে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহতি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে। এটা অনাকাঙ্খিত। এরজন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যাবসায়িসহ সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে জলদস্যুদের প্রতিহত ও নির্মূল করতে হবে।

বাউফল সাংবাদিক মহলসহ সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, পায়রা সমুদ্র বন্ধর অবহেলিত দক্ষিাণাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা বৃদ্ধি করতে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এ এলাকায় শিল্প গড়ে উঠলে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হবে। নদী মাতৃক দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার পুলিশ প্রশাসন উদ্যোগি হলে জলদস্যুদের শতভা নির্মূল করা সম্ভব।