বাউফলে আজও নির্মিত হয়নি গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ

3

অতুল পাল, বিশেষ প্রতিনিধি : বিজয়ের ৪৪ বছর পরেও স্বাধীনতা যুদ্ধে বাউফলের ধুলিয়া, মদনপুরা, চন্দ্রপাড়া ও কনকদিয়া এলাকায় হানাদার বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার ৪৪ জন নারী পুরুষের নামে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। বাউফলের নতুন প্রজন্ম জানতে পারছেনা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের আত্মত্যাগের কথা। গণহত্যার শিকার পরিবারগুলো তাদের স্বজন হারাদের আজও কাগজ কলমে কোন স্বীকৃতি আদায় করতে পারেননি। কখনো কোন আলোচনায়ও উঠে আসেনি তাদের নাম।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর আহবানে এপ্রিল মাসে মরহুম সৈয়দ আহমেদের পরামর্শে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা এমএ ওয়াদুদ মিয়ার নেতৃত্বে বাউফলে ২১ সদস্য বিশিষ্ট সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল। সংগ্রাম কমিটিকে সক্রিয় রাখতে তৎকালিন বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ভিপি বর্তমান জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ স ম ফিরোজ সর্বদা উদ্বুদ্ধ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গাজী পঞ্চম আলী ওরফে পি আলী, আবদুল বারেক হাওলাদার ও হাবিলদার মকিম আলীর নেতৃত্বে ৪৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে জুন মাস থেকে তারা বাউফলের কয়েকটি অংশে বিভিক্ত হয়ে অবস্থান নেন। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাপড়-চোপড়, খাদ্য, ওষুধ ও আর্থিকভাবে মদনপুরা, কনকদিয়া, কালিশুরী ও ধুলিয়ার কিছু পরিবার সহায়তা করেছিল। হানাদার বাহিনী এখবর পেয়ে ৬ আগষ্ট ধুলিয়াতে অভিযান চালিয়ে ২৫ জনকে হত্যা করে তাদের ঘরবাড়ি লুটপাট শেষে পুড়িয়ে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা এ খবর পেয়ে ধুলিয়া সংলগ্ন কালিশুরী-চাঁদকাঠীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আলগী নদীর শিবপুর, সানেশ্বর, দক্ষিণ চাঁদকাঠী ও কুমারখালীতে অবস্থান নিয়েছিল। ১১ সেপ্টেম্বর হানাদার বাহিনী রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করলে উভয়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা সন্মূখ যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ৪ জন হানাদার মারা গেলে অবশিষ্টরা পালিয়ে বাউফল থানায় চলে আসে। ৪ হানাদারকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তারা ১৬ সেপ্টেম্বর মদনপুরা ও চন্দ্রপাড়ায় আক্রমণ করে তারা ১৭ জনকে হত্যা করে তাদের ঘরবাড়ি পুড়য়ে দেয়।

বাউফলের প্রবীন শিক্ষাবিদ বাউফল আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক কেওয়াইএম কামারুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাউফলে ৪৪ জনকে গণহত্যা করা হয়েছে এটা কেবল কাগজে-কলমে। বাস্তবে আরো অনেককেই হত্যা করা হয়েছিল। যার কোন তথ্য আমাদের জানা নেই। অনেক পরিবার লুটপাট ও অগ্নিকান্ডের ফলে নি:স্ব হয়ে গিয়েছিল। অনেক অ-মুক্তিযোদ্ধা নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও গণহত্যার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোন কিছুই পাচ্ছেননা। এমনকি তাদের নামে কোন স্মৃতিফলকও নেই। মদনপুরা গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধা  সেতারা বেগম জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবা সেকান্দার আলী মৃধাসহ গ্রামের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিল। একারণে হানাদার ও আলবদর রাজাকার বাহিনীর দল তাঁর বাবাসহ তাজেম আলী, সোনা খাঁ, শাহাবুদ্দিন, সোবাহান, রাজ্জাক, সেরাজ, কাঞ্চন, আলাউদ্দিন মাষ্টার, মহসিন, কেরামত, রশিদ এবং সানু চাপরাশিসহ ১৪ জনকে গণহারে গুলি করে হত্যা করেছে। একই গ্রামের গণহত্যার শিকার তাজেম আলীর ছেলে আনছার উদ্দিন জানান, তার চোখের সামনেই বাড়ির উঠানে তার বাবাকে হানাদাররা গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি আবেগ-আপ্লুত হয়ে জানান, ৪৪ বছরের মধ্যে সরকারের কাছ থেকে কেবল ২ বান্ডেল ঢেউটিন পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হানাদার বাহিনীর অবস্থান ও অন্যান্য খোঁজখবর দিত বাউফল থানায় দুধ বিক্রেতা অশীতিপর বৃদ্ধ খোর্শেদ মৃধা। এক বছর আগে দুর্ঘটনায় তাঁর পা ভেঙ্গে যায়। টাকার অভাবে সঠিক চিকিৎসাও করাতে পারছেনা।  বার্ধক্যজনিত কারণে এখন সে মৃত্যুপথযাত্রী। কোন সংবাদকর্মী দেখলে এখনো সে চিৎকার করে বলে ওঠেন, “৭১ এর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার”। ক্ষীণকণ্ঠে তিনি জানান, হানাদার বাহিনী তার বাড়ির তিনজনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। ওই সময় ভাঙ্গা একটি কবরের মধ্যে শরীর লুকিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেছেন। তিঁনিও আবেগ করে বলেন, বাউফলে অনেককে গণহারে গুলি করে হত্যা করা হলেও তাদের শরনার্থে নাম ফলকসহ কোন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। এব্যপারে বাউফল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শামসুল আলম মিয়া বলেন, বিষয়টি সত্য। আমরা এখনো তাদের নামে কিছু করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাউফলে গণহত্যার শিকার মানুষদের নামে একটি স্মৃতিফলক সহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।