বাউফলে বঙ্গবন্ধুর পদার্পণ দিবস, স্মৃতিচারণের উদ্দ্যোগ নেই

5

 

অতুল পাল, বিশেষ প্রতিনিধি: ১৯৭০ সালের ১৬ অক্টোবর। এ তারিখেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী প্রচারণায় দক্ষিণ বাংলার শিক্ষিত জনপদ বাউফলের কালাইয়া বন্দরে এসেছিলেন। দিনব্যপি অবস্থানের পর বিকেলে কালাইয়া বন্দরের ধান হাটের মাঠে বিশাল এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন বিশ^নন্দিত অবিসংবাদিত এই নেতা। ওই সময় বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখা এবং তার বজ্র কণ্ঠের ভাষণ শোনার জন্য আস পাশের কয়েক থানার মানুষ নৌকা, লঞ্চ এবং পায়ে হেটে কালাইয়াতে এসেছিলেন। ভাষণ দেয়ার আগে ধানহাট সংলগ্ন কালাইয়া গার্লস স্কুলের পাটাতন করা ছোট্ট একটি কক্ষে কর্মীসভা করার সময় দর্শক-শ্রোতাদের ভীরে ভেঙ্গে পরেছিল ওই কক্ষটি। জনসভা শেষে কক্ষটি মেরামতের জন্য বঙ্গবন্ধু স্কুলের তৎকালিন প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেকের হাতে ৫ হাজার টাকা অনুদানও দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বিশ^বরেণ্য এই নেতার স্মৃতিবিজরিত স্মৃতি রক্ষায় আজও কোন স্মৃতি ফলক নির্মিত করতে পারেনি স্কুল কর্তৃপক্ষ। পালন করা হয়না কোন স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান। স্কুল ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক মন্ডলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দিবসটি পালনে নিরোৎসাহিত।

 

বাউফলের বয়োজেষ্ঠ্য সমাজকর্মী জগদীশ চন্দ্র দত্ত বণিক জানান, ১৯৭০ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তার ছোট্ট একটি লঞ্চে করে বগা থেকে কালাইয়া বন্দরের তহশীল অফিসের ঘাটে নামেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান তৎকালিন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত এম.এ. গফুর মিয়া, বরিশাল ব্রজমোহন বিশ^বিদ্যালয় কলেজের ভিপি বর্তমান জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ, প্রয়াত ডা.শাহজাহান মিয়া, প্রয়াত দানেশ মিয়া, প্রয়াত বিজয় দেবনাথ, আবদুল ওয়াহেদ মুন্সি প্রমূখ। প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কালাইয়া বন্দরের সদর রোডটি পায়ে হেটে কালাইয়া গালর্স স্কুলের একটি কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ওই সফরের সময় জাতীয় পর্যায়ের অন্যান্য কে কে ছিলেন সেটা ষ্পষ্ট করে কেউ বলতে পারছেননা।  স্থানীয় প্রবীনরা জানান, কালাইয়া ধান হাটের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ১৯৪৭ সালের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালিদের সাথে ঐতিহ্য, কৃষ্টি, স্বকীয়তা এবং বাঙ্গালির জাতীয় চেতনা নিয়ে শক্রতা করে আসছে পশ্চিম পাকিস্তান। মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে না দেয়ার জন্য অনৈতিক প্রভাব দেখানো হচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারসহ অসংখ্য ছাত্র জনতার প্রাণ দিতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে পশ্চিম পাকিস্তান কিভাবে পূর্ব পাকিস্তানের জণগণকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করেছিল তার বিষদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, বাঙ্গালিদের সাথে কোন প্রকার তালবাহানা চলবে না সেটা ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েই এদেশের ছাত্রজনতা পশ্চিম পাকিস্তানকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, জাতীয় এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে নৌকায় ভোট দিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এক জোট হয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে যে কোন ধরণের তালবাহানা সহ্য করা হবেনা। ঐতিহাসিক ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করলেও পশ্চিম পাকিস্তান ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে রাজি না ও হতে পারেন। সেজন্য তিনি দেশবাসিকে সজাগ থাকারও আহবান জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই সন্দেহই পরিনামে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর দুরদর্শি চিন্তারই বহি:প্রকাশ বলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা আবেগ-আপ্লুত হয়ে এ প্রতিনিধিকে জানান, কালাইয়া বন্দরে মহান এই নেতার পদার্পণ ছিল এলাকাবাসীর সৌভাগ্য। যে স্কুলটিতে তিনি অবস্থান করেছিলেন, সেটিও একটি পূণ্যস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু স্কুলটির কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও কেবলমাত্র উদ্যোগের অভাবে বঙ্গবন্ধুর নামে কোন স্মৃতিফলক হচ্ছেনা। এটা সত্যিকার অর্থে লজ্জা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সামিল। এলাকাবাসীরা আরো জানান, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ৪/৫ বছর পর কালাইয়া বন্দরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ি ঈশ^র পাল, কিশোরী পাল, রাই মোহন পাল, রাধিকা মোহন পাল গং গণ অনেক সম্পত্তি রেখে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার তাদের সম্পত্তি শক্র সম্পতি হিসেবে তালিকাভূক্ত করেন।  ১৯৫৪ সালে স্থানীয় নূর হোসেন হাওলাদার ওরফে লাল মিয়া, বর্তমান জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজের পিতা মরহুম ইদ্রিছ মোল্লা, মরহুম এম.এ.গফুর মিয়া, মরহুম ডা. শাহজাহান মিয়াসহ স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা ঈশ^র পালদের জায়গায় একটি গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর পরই স্কুলটির নামকরণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ে স্কুলটির নাম কালাইয়া বালিকা বিদ্যালয় করার জন্য সিংহভাগ শিক্ষানুরাগী এক মত হলেও নূর হোসেন হাওলাদার ওরফে লাল মিয়া ওই সম্পত্তি তার মা হায়াতুন্নেচ্ছা বেগমের নামে ক্রয় করা মর্মে জানালে স্কুলের নামকরণ হায়াতুন্নেচ্ছা বালিকা বিদ্যালয় করা হয়। একপর্যায়ে হায়াতুন্নেচ্ছা বেগমের নামে কোন জমি নেই এমন তথ্য জানাজানি হলে নূর হোসেন হাওলাদার ওরফে লাল মিয়া ব্যাতিত অন্যান্য শিক্ষানুরাগীরা স্কুল প্রতিষ্ঠাতাদের তালিকা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন। স্কুলটি সরকারিকরণের এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক সরেজমিন স্কুলটি পরিদর্শনে এসে সরকারি জায়গায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বিধায় হায়াতুন্নেচ্ছা নামে কোন স্কুলকে সরকারিকরণ করা যাবেনা বলে জানিয়ে দেন। স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ও অবসরে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, স্কুলের স্বীকৃতি, পূণ:স্বীকৃতি এবং মন্ত্রণালয়ের অডিটের সময় থানার করা একটি জিডির কপি দেখানো হয়। জানা গেছে, ওই জিডিতে ১৯৭০ সালের বন্যায় হায়াতুন্নেচ্ছার নামে ক্রয় করা দলিল-দস্তাবেজ হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকরা জানান, ওই দাবি নিয়েই নূর হোসেন হাওলাদার ওরফে লাল মিয়া স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটিতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে রয়েছেন এবং স্কুল থেকে সম্মানি ও স্কুলের জায়গায় বসবাস করে আসছেন। যেহেতু লাল মিয়া বয়োবৃদ্ধ মানুষ সেহেতু এ বিষয়টি নিয়ে কেউ তৎপর হচ্ছেন না। তবে এঘটনা নিয়ে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গদের মধ্যে চরম ক্ষোভও রয়েছে।  তবে ওই জমির সর্বশেষ তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, হিন্দুদের ওই সম্পত্তি কালাইয়া হায়াতুন্নেচ্ছা বালিকা বিদ্যালয় কিংবা হায়াতুন্নেচ্ছা বেগমের নামে নেই। ওই সম্পত্তি সরকারের “ক তফশীলভূক্ত” রয়েছে। অর্থাৎ এখনো সরকারি সম্পত্তি হিসেবেই কাগজ কলমে রয়েছে। এমতাবস্থায় স্থানীয়রা মনে করেন, যেহেতু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলটিতে পদার্পণ করেছেন। তাই সকল বিতর্কের উর্ধে উঠে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রক্ষার্থে বঙ্গবন্ধুর নামেই স্কুলটি নামকরণ করা যেতে পারে।

স্থানীয় এমপি ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ জানান, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ধরে রাখা এবং শিক্ষার্থীসহ নতুন প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চর্চা করতে পারে এ চিন্তা করেই ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ স্কুলটির অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হল নামে একটি ভবনের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। আশা করি শীঘ্রই ভবনটির কাজ শেষ হবে। ভবনটিতে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ইতিহাস সম্বলিত বিভিন্ন বই রাখা হবে।