বাউফলে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য

3

 

অতুল পাল, বিশেষ প্রতিনিধি: বাউফলে মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোটি কোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছে। ফরমপূরণ, মডেল টেষ্ট কিংবা পাঠোন্নতি ফি, কোচিং ইত্যাদি নামে প্রতিবছরই বিশাল অংকের এ টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে কোন পদক্ষেপই নিচ্ছেননা। অভিভাবকরাও অসহায় হয়ে ওই টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে,  জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফরম পূরণ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও অভ্যন্তরীনভাবে শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়ন পরীক্ষা ফি, মাসিক ফি, সেশন ফি ও কোচিং ফি ইত্যাদি নামে গেল এক বছরে প্রায় ২৯ কোটি টাকা আদায় করে নেয়া হয়েছে। চলতি বছর ৪ হাজার ৪৫৭ জন জেএসসি পরীক্ষার্থীর ফরম পূরণের সময় প্রত্যেকের থেকে ৭০০ টাকা হারে ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০, জেডিসির ২ হাজার ৪২ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ৭০০ টাকা হারে ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৪০০, এসএসসির ফরম পূরণে ৩ হাজার ৬৫৩জনের থেকে ১ হাজার টাকা হারে ৩৬ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও  দাখিল পরীক্ষার ফরম পূরণে ১ হাজার ৪৪৮ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১ হাজার টাকা হারে আদায় করা হয়েছে ১৪ লাখ  ৪৮ হাজার টাকা। এসএসসি, দাখিল, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় প্রবেশপত্র আটকে রেখে শিক্ষার্থী প্রতি ২০০ টাকা হারে নেয়া হয়েছে ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। ভর্তি ফি নেয়ার বিধান না থাকলেও ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরের ৩৬ হাজার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গড়ে ২০০ টাকা হারে আদায় করে নেয়া হয়েছে ৭২ লাখ টাকা। স্পেশাল কোচিংয়ের নামে ৮ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গড়ে ১ হাজার টাকা হারে আদায় করা হয়েছে ৬৪ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা। অর্ধ বার্ষিকি এবং বার্ষিক পরীক্ষার বাইরে অন্য কোনো মাসিক পরীক্ষা নেয়া যাবেনা সরকারি এমন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ক্লাস টেস্ট পরীক্ষার ফির নামে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা হারে আদায় করা হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। যা সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি। মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক হওয়ার পরেও তাদের থেকে আদায় করা হয়েছে সেশন চার্জ। এসএসসি পরীক্ষায় ব্যাবহারিক পরীক্ষার নামে প্রায় ৫ হাজার এসএসসি/সমমানের শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে আদায় করা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ  টাকা। এছাড়াও বিবিধ ফি এর নামে নেয়া হয়েছে আরো প্রায় ২০ লাখ টাকা। এরপরেও রয়েছে প্রাইভেট বাণিজ্য। অপরদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না সরকারের এমন বিধিনিষেধ থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদেরকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শ্রেণি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রাইভেট পড়লে পাশ আর না পড়লে ফেল। ঘটনাটি এমন হয়েছে যে, পরীক্ষায় পাশ ফেলের মাণ নিয়ন্ত্রক হয়ে দাড়িয়েছে শ্রেণি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া কিংবা না পড়ার ওপর। এমন অনেক শিক্ষকও রয়েছেন যারা নিয়মিত বিদ্যালয় বসেই প্রাইভেট পড়ান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাউফলে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ১ হাজার টাকা হারে প্রাইভেট বাণিজ্যের নামে গত ১ বছরে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২৪ কোটি টাকা। এমনও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে বিদ্যালয় চলাকালীন সময়েও প্রাইভেট পড়ানো হয়। এছাড়াও রয়েছে গাইড বই বাণিজ্য। সরকার সবধরনের গাইড বই নিষিদ্ধ করলেও  গাইড বই প্রকাশকদের প্রতিনিধি হিসেবে লাইব্রেরী থেকে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে গাইড বই তুলতে বাধ্য করছেন এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষক। সব মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকগণ স্বীকার করে বলেন,  বর্তমানে শিক্ষা সেক্টরেই বেশি দূর্নীতি হচ্ছে। নীরব ঘাতকের মতো প্রতিটি ঘরেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। দেখার কেউ নেই। অথচ প্রতিটি সেক্টরেরই কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য উপজেলা ভিত্তিক অফিসার রয়েছেন। অজানা কারণেই তারা এসব দূর্নীতি এরিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে অতিরিক্ত ফি আদায়কারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা ফেরৎ দেয়ার জন্য মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও বাউফলে এখনো এমন কোন নজির সৃষ্টি হয়নি। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, সরকার শিক্ষকদের বেতনভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিলেও তাদের নৈতিকতার একটুও পরিবর্তন হয়নি। তারা আরো জানান, শিক্ষার সংখ্যাগত উন্নয়ন ঘটলেও গুণগত কোন উন্নয়ন হয়নি। বিষয়গুলোর প্রতি কঠিনভাবে নজরদারি না করলে শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে বলেও তারা মতামত দেন।