শত বর্ষে লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী   ছোট্ট টিনের ঘর থেকে দোতলা ভবন

19

 

জাহাঙ্গীর হোসেন, পটুয়াখালী প্রতিনিধিঃ ছোট্ট টিনের ছাউনিতে শুরু হওয়া লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে শতবর্ষে পদার্পন করছে। ১৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯১৬ সালের ১ জানুয়ারি পথ চলা শুরু হলেও এখন এ বিদ্যাপিঠে অধ্যয়ন করছে ৭৫০ জন জ্ঞান পিপাসু। পটুয়াখালী শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌরভবনের দক্ষিণ পাশে ৪.৮৮ একর জমির ওপর মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ পালনে ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর দু‘দিন ব্যাপি নানা অনুষ্ঠানের ঝাঁকজমক আয়োজন করা হয়েছে।

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাঃ নদ-নদী বেষ্টিত পটুয়াখালী অঞ্চল বরাবরই শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। ১৮৭১ সালে পটুয়াখালী মহকুমা হলে শিক্ষা প্রসারে কিছু উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। সরকারি হিসেব মতে, ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছওে পটুয়াখালী জেলায় মাত্র ৩০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ১৮৮৭ সালে সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, দ্বিতীয়টি বিবিচিনি নিয়ামত আলী ইউনাইটেড হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে আর তৃতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী।

প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর বিদ্যালয়টি ১৯২১ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাপিঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। ১৯৫১ সালে দেশের একমাত্র ’ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের’ অধীনস্থ থাকে বিদ্যালয়টি। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হলে সেই বোর্ডের এবং ২০০০ সালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বর্তমানে সেই বোর্ডের অধীনে বিদ্যালয়টি সুচারুরুপে, সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে।

শুরুতে বিদ্যালয়টি প্রথম থেকে ১০ম শ্রেনী পর্যন্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ হলে প্রথম থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী থেকে আলাদা হয়ে ‘লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ রুপ নেয় যা বিদ্যালয়ের ক্যম্পাসেই অবস্থিত।

বিদ্যালয়টির নামকরণঃ ১৯১৬ সালে বিদ্যুৎসাহী আব্দুল লতিফ ছিলেন তৎকালীন মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট এবং একই সাথে পটুয়াখালী মিউনিসিপ্যালিটির প্রশাসক। তার ঐকান্তিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এ বিদ্যাপিঠ। আব্দুল লতিফ ছাড়াও তৎকালীন সমাজ হিতৈষী রায় বাহাদুর শাম চন্দ্র সিমলাই, বিহারী লাল সেন গুপ্ত , রামধন চক্রবর্তী প্রমুখ বিদ্যালয়টি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।  প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর ব্যয়ভার অনেকটা মিউনিসিপ্যালিটি বহন করত বিধায় তাঁর নামানুসারে বিদ্যালয়টি নাম করণ করা হয়  ‘লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী’। রবি ঠাকুরের ছাত্রাবস্থায় ওরিয়েন্টাল সেমিনারী অনুসরণ করেই সম্ভবত বিদ্যালয়ের পরিবর্তে সেমিনারী রাখা হয়।

অবকাঠামোঃ ঠিনের ছাউনি থেকে পদযাত্রা শুরু হলেও এখন প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে ছোট-বড় ৬ টি ভবন যেখানে কক্ষ রয়েছে ৩২ টি। লম্বাকার দ্বিতল বিশিষ্ট মূল ভবনটি নির্মান কাজ শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। এছাড়াও সুবিশাল মাঠের পশ্চিম পার্শে ১৬ কক্ষ বিশিষ্ট ছাতাবাস, পূর্ব পাশে বিজ্ঞান ভবন, লাইব্রেরি, কম্পিউটার ভবন, ফ্যাসিলিটিজ ভবন, রেডক্রিসেন্ট ভবন। মাঠের মাঝ বরাবর পূর্ব পাশে রয়েছে মসজিদ। বিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস মিলিয়ে বই রয়েছে সাড়ে ৪ হাজার।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীঃ ১৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেনী পর্যন্ত ৭৫০ জন  শিক্ষার্থী রয়েছে। ১৮ জন শিক্ষক, ৫ জন কর্মকর্তা আছেন এখানে। সৃষ্টিশীল শিক্ষক আশুতোষ চক্রবর্তী ছিলেন এ বিদ্যাপিঠের প্রথম প্রধান শিক্ষক। এছাড়াও গণেশ চন্দ্র সেন, রাজ কুমার সেন, সুরেন্দ নাথ রায়, অসিতা রঞ্জন ভট্টাচার্য, মোয়াজ্জেম হোসেন, এম এ গফুর, এম এ রব প্রমুখ পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

সহ-শিক্ষা কার্যক্রমঃ খেলাধুলাসহ সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে বিদ্যালয়টি সুনাম, খ্যাতি আকাশচুম্বি। ক্রীড়াঙ্গনে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় আর লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারী চির প্রতিদ্বন্দ্বি। সাফল্যেও দিক থেকে লতিফ মিউনিসিপ্যাল এগিয়ে। ফুটবল, বাস্টেবল, ভলিবল, হকি, হা-ডু-ডু, দাবা, ক্রিকেট সব ধরনের প্রতিযোগিতায় রয়েছে বিদ্যালয়ের সুনাম।

শতবর্ষে পদার্পন অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বর্নাঢ্য র‌্যালী, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণসহ নানা বর্ণিল আয়োজন।