সার ডিলারদের দৌরাত্ম  ন্যায্য দামে সার পাচ্ছেনা উপকূলের কৃষক

36

 

pic-4

বিশেষ প্রতিনিধি : সার ডিলারদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্য দামে সার পাচ্ছেনা পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার কৃষকরা। সরকারের দেয়া ভর্তুকি নিশ্চিত করতে কোনই পদক্ষেপ নিচ্ছেনা কৃষি বিভাগ। বিসিআইসি’র সার ডিলারদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে কৃষকদের সার ক্রয়ে সরকারের উদ্যোগ কোন কাজে আসছেনা। সার ডিলার নিয়োগ বিধি উপেক্ষা করে নিয়োগ পাওয়া প্রভাবশালী সার ডিলাররা স্থানীয় কৃষি বিভাগকে ম্যানেজ করে অধিক মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রী করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সিডর-আইলা বিধ্বস্ত উপকূলীয় এলাকার কৃষকরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। এমনকি বিসিআইসি’র ডিলার না হয়েও অনেক ব্যবসায়ী বছরের পর বছর ধরে অন্যের লাইসেন্স নিয়ে নির্বিঘেœ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সার-বীজ মনিটরিং কমিটি সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোন অ্যাকশন না থাকায় সার ব্যবস্থাপনা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবন এ উপকূলীয় এলাকায়।

 

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ মূল্য ৮০০ টাকা, প্রতি কেজি ১৬টাকা, প্রতি বস্তা টিএসপি ১১০০, প্রতি কেজি ২২ টাকা, প্রতি বস্তা ডিএপি ১২৫০, প্রতি কেজি ২৫ টাকা, প্রতি বস্তা এমওপি ৭৫০ টাকা, প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রীর নিয়ম রয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, জেলার কলাপাড়ায় বিসিআইসি’র ৭ জন ডিলার এবং ৬২ জন সাব-ডিলার রয়েছে, গলাচিপায় ১২ জন বিসিআইসি’র ডিলার এবং ৯১ জন সাব ডিলার, দশমিনায় ২ জন বিসিআইসি’র ডিলার এবং ১৯ জন সাব ডিলার, পটুয়াখালী সদর উপজেলায় বিসিআইসি’র ১২ জন ডিলার এবং ৫৩ জন সাব-ডিলার, মির্জাগঞ্জে বিসিআইসি’র ৮ জন ডিলার এবং ৩৭ জন সাব-ডিলার, বাউফলে বিসিআইসি’র ১৪ জন ডিলার এবং ৬০ জন সাব-ডিলার, রাঙ্গাবালী উপজেলায় বিসিআইসি’র ৪ জন ডিলার এবং ১৪ জন সাব-ডিলার রয়েছে । এবছর জেলায় মোট সারের বরাদ্দ ছিল ইউরিয়া ১৫০০০ মেট্রিক টন, টিএসপি ৪৮০০ মেট্রিক টন,  ডিএপি ২৫০০ মেট্রিক টন, এমওপি ৩০০০ মেট্রিক টন, জিপসাম ৫০০ মেট্রিক টন এবং জিংক সালফেট ৩০ মেট্রিক টন। এ বছর জেলায় বোরো চাষের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ২,১৫০ হেক্টর, আউশ ৩০,৯৬৫ হেক্টর, আমন ২,১০,৬০০ হেক্টর, গম ৫৫৬ হেক্টর, ভুট্রা ৭০৫ হেক্টর, সূর্যমুখী ৭৩০ হেক্টর, তরমুজ ১৭, ৭৬২ হেক্টর এবং রবিশষ্য গ্রীষ্মকালীন ৪,৬০০ ও শীতকালীন লক্ষ্য মাত্রা ছিল ১৬, ০০০ হেক্টর।

 

সরেজমিনে শনিবার সকালে উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের মজিদপুর গ্রামে গিয়ে কৃষক মো: দুলাল আকন এর সাথে কথা বলে জানা যায়, ’এ বছর ৬৬ শতাংশ জমিতে তিনি পাতা কপি, ফুল কপি, লাউ, মূলা, লাল শাক, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, শাল গম চাষ করেছেন। তার সবজি ক্ষেত করার জন্য প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সবজি ক্ষেতের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি বাজার থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২০ টাকা, টিএসপি ২৮-৩০ টাকা, পটাশ ২০ টাকা, জিপসাম ৪০ টাকা এবং জিংক সালফেট ১৪০ টাকা দরে কিনেছেন। দুলাল আকনের মত একই কথা বললেন নীলগঞ্জ ইউনিয়নের অন্য কৃষকরা। কৃষকদের দাবী বর্ষা মৌসুমে বেশী দামে সার বিক্রী করার জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সার ডিলাররা। এছাড়া মাঝে মাঝে সার কেনার পর নি¤œ মানের সারের কথাও জানান কৃষকরা। যাতে তাদের উৎপাদন ব্যহত হয়। এমনকি ডিলারদের কাছে মেমো চাইলে তারা মেমো দেয় না বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একটি সূত্র জানায়, জেলার একাধিক উপজেলায় কৃষকদের চাহিদার তুলনায় সার-ডিলারের সংখ্যা কম থাকলেও  রহস্যজনক কারনে সার ডিলার নিয়োগ করার কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এছাড়া অনিয়মের মাধ্যমে জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স পেয়েছে। কোন কোন ডিলার তার লাইসেন্স নিজে পরিচালনা না করে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দেয়ায় বিসিআইসি’র লাইসেন্স ব্যবহার করে ওই সকল ব্যবসায়ীরা বাফার গুদাম ইনচার্জ ও বিসিআইসি’র গুদাম ইনচার্জ কে ম্যানেজ করে সার গ্রহন করছে। ইতোপূর্বে সার কেলেংকারীর অভিযোগে কৃষি বিভাগের দু’উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র রায়, আবদুর রহমান সহ সার ব্যবসায়ী শহিদ খান, আবুল কালাম আজাদ, মো: শহীদুল ইসলাম ও মো: রুহুল আমিন এর নামে মামলা দায়ের করা হলেও কৃষি বিভাগের উদাসীনতায় তদন্তকারী কর্মকর্তার দুর্বল তদন্ত হেতু এর তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি।

 

সূত্রটি আরও জানায়, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ, ব্যাংক সলভেন্সি, স্থানীয় অধিবাসী, নির্দিষ্ট স্থানে গুদাম সহ নিজস্ব শো-রুম থাকার বিধান না মেনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অধিকাংশ ডিলারদের। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ভর্তুকী দিলেও কৃষি বিভাগের যথাযথ মনিটরিং এর অভাবে কৃষকরা অধিক মূল্যে সার ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সার-বীজ মনিটরিং কমিটি কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারছেনা। এমনকি উপজেলা পর্যায়ের সার-বীজ মনিটরিং কমিটির দু’একজন সদস্যের কাছে মনিটরিং কমিটির মিটিং সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তারাও মুখ খুলছেনা। এছাড়া জেলায় কৃষি বিভাগের মোট ১৫৪ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। এসকল কর্মকর্তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ এক যুগ ধরে একই স্থানে কর্মরত রয়েছেন।

 

বিসিআইসি’র লাইসেন্স প্রাপ্ত সার ডিলার খেয়া এন্টার প্রাইজ, কলাপাড়া এর মালিক মো: জিয়াউর রহমান জানান, আমি সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী সার বিক্রী করি। সারের বস্তায় হুক মারার কারনে অনেক সময় ওজন সঠিক থাকছেনা। তাছাড়া বরিশাল গুদাম থেকে সার গ্রহন করে গুদামে তুলতে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

 

পটুয়াখালী কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো: নজরুল ইসলাম মাতুব্বর এ প্রতিনিধিকে জানান, সার নিয়ে জেলার কোথাও কোন অভিযোগ নেই। সরকারের নির্দেশনা অনুসারে কৃষি বিভাগ কৃষকদের সেবক হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। কোন ডিলারের বিরুদ্ধে বেশী দামে সার বিক্রীর অভিযোগ পেলে কৃষি কর্মকর্তাদের তাৎক্ষনিক আইনী ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনা দেয়া আছে বলে জানান তিনি। #