স্বল্প পরিসরে পায়রা সমুদ্রবন্দরের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু আজ

7

গোফরান পলাশ, কলাপাড়া প্রতিনিধি: দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রা বন্দরের বহির্নোঙ্গরে প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি ফরচুন বার্ড পদ্মা সেতু নির্মাণের পাথর নিয়ে রামনাবাদ চ্যানেলের বহির্নোঙ্গরে পন্য খালাসের মধ্য দিয়ে আজ (সোমবার) স্বল্প পরিসরে পায়রা সমুদ্রবন্দরের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হলেও এটি পুরোপুরি চালু হবে ২০১৮ সালে। পায়রা বন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিশেষ সুবিধাও দিতে যাচ্ছে সরকার। আর এর ফলে বন্দরটি চালুর মধ্য দিয়ে নিরাপদ বাল্ক পণ্যাদি নদীপথে পরিবহনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে এ বন্দরের কার্যক্রম শুরুর খবরে দক্ষিণ উপকূলে বিরাজ করছে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ।

 

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগমের সভাপতিত্বে সম্প্রতি ‘পায়রা সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম ও অগ্রগতি’ শীর্ষক সভায় পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানিতে প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি বা শুল্কছাড়ের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়। পায়রা বন্দর এলাকায় বন্দর, জেটি, কন্টেইনার টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি চলমান ‘পায়রা কাস্টমস হাউজ’র জমি দ্রুত অধিগ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পায়রা বন্দরে আমাদের কাস্টমস হাউসের আওতাধীন কতটা এলাকা থাকবে তা ইতিমধ্যে আমরা নির্ধারণ করেছি। এখন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়া সাপেক্ষে ঘোষণা করা হবে ‘পায়রা কাস্টমস হাউজ’। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ পিপিএর সচিব মুহাম্মদ রেজাউল কবির বলেন, পুরো বন্দরের সব অবকাঠামো এখনো হয়নি। তবে স্বল্প পরিসরে বন্দর এখন ব্যবহার উপযোগী হয়েছে। কিছু অফিস হয়েছে। কাস্টমসের প্রাথমিক কার্যালয় হয়েছে। তাই আজ  বন্দরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পাথর নিয়ে চীন থেকে জাহাজ নঙ্গর করবে। এ জাহাজটি বন্দরের মুল টারমিনাল থেকে ২০ কিলোমিটার সাগরের গভীরে থেকে কয়লা অপর জাহাজে খালাস করবে। তিনি আরো জানান আগামী ১৩ আগষ্ট নৌ পরিবাহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বন্দরের আনুষ্ঠানিক কাজের উদ্ধোধন করতে পারেন। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে পায়রা বন্দর চালু হবে। তবে বন্দরটি ২০১৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালু হবে। এ কার্যক্রম চালুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হচ্ছে পায়রাবন্দর সংলগ্ন এলাকার মানুষের। বন্দরকে ঘিরে প্রকল্প এলাকায় এখনও চলছে বিরামহীন উন্নয়ন কার্যক্রম। শত শত শ্রমিক পেয়েছে কর্মসংস্থান। টিয়াখালী নদী তীরে প্রকল্প এলাকা এখন পরিণত হয়েছে আলোকিত জনপদে। যে জনপদে মানুষ তার জমিজমা আবাদে দেখাতো অনীহা। এখন সেখানে তারা সোনার দামে জমি বেচাকেনার স্বাদ নিচ্ছেন। আর্থিক দৈন্যের যেন ইতি টানছেন এসব বঞ্চিত মানুষেরা।

 

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, রামনাবাদ মোহনা থেকে কাজল, তেতুলিয়া নদী হয়ে কালীগঞ্জ পর্যন্ত সমুদ্রের (নৌ-পথের) গভীরতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে।  অধিকাংশ রুটের গভীরতা সাত থেকে ১৫ মিটার। তবে শুধুমাত্র চালিতাবুনিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় খনন কাজ করতে হবে। সূত্রটি আরও জানায়, অন্যান্য বন্দরে জাহাজ চলাচলে যেমন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয়। পায়রা বন্দরের সঙ্গে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে এ ধরনের সমস্যা নেই। গভীরতা বেশি থাকায় এ রুটে ২৪ ঘন্টা জাহাজ চলাচলের সুযোগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ইতোমধ্যে কাউয়ারচরে বাতিঘর স্থাপনের কাজ চলছে। সাগর মোহনা থেকে রামনাবাদ চ্যানেল পর্যন্ত নদীতে সীগন্যালিং বয়া এবং কিনারে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়েছে। পায়রা বন্দর থেকে কুয়াকাটাগামী মহাসড়কের রজপাড়া পর্যন্ত চার লেনের মূল সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। চলতি বছর লালুয়ার চারিপাড়া সহ আশপাশ এলাকার প্রায় সাত হাজার একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্তের পথে। এলক্ষ্যে এ প্রকল্পের জন্য তিন শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। চারিপাড়ায় মূলবন্দরের কাজ শুরু করতে বিদেশী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

সূত্রটি আরও জানায়, পায়রা বন্দর এলাকা এক্সক্লুসিভ জোনে পরিণত হবে। এছাড়াও নৌবাহিনীকে আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে খুব শীঘ্রই সাবমেরিন সংযোজিত হতে যাচ্ছে পায়রা বন্দরে। দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দরের পাশে স্থাপিত এই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক নৌঘাঁটিতে নৌ কমান্ডো, এভিয়েশন, জাহাজ ও সাবমেরিন বার্থিং সুবিধা থাকবে। এই ঘাঁটি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যবর্তী হওয়ায় এখান থেকে নেভাল এভিয়েশান কার্যক্রম পরিচালনা করে দেশের বিস্তৃত সমুদ্র এলাকায় নজরদারী রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়। সমুদ্রে মোতায়েনকৃত জাহাজ সমূহে লজিস্টিকস্ সুবিধা প্রদান সহজতর হবে। এই ঘাঁটির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অপরাধ দমনে নৌবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে সাধারণ জনগণের জানমাল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।  এছাড়া নৌবাহিনী তার নিজস্ব বিভিন্ন অপারেশনাল ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য সরকারের গৃহীত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতেও সক্ষম হবে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শের-ই-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এর নামানুসারে প্রায় ৫০০ একর জমির উপর স্থাপিত এই  ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বানৌজা শের-ই-বাংলা’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ওই দিনটি হয়ে আছে ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসাবে। যা ছিল মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। এর বাস্তব প্রতিফলন এখন দেখছেন তারা। ফলে অজানা, অচেনা এ জনপদ এখন হয়ে আছে কর্মমুখর। ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলবে অন্তত টানা ১৫ বছর। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে মানুষ সারা বছর থাকবে সম্পৃক্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাকৃতিক বৈরি পরিবেশ, জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত বিপর্যয় উপলব্ধি করতে পেরে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় পরিবর্তনের ছোঁয়া এনে দিয়েছেন। শিল্পভিত্তিক অঞ্চল ছাড়াও পর্যটন শিল্পকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রুপ নিতেই তার এ প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। ২০১৩ সালের ৩ নবেম্বর, মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পায়রা সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ পাশ হয়। এ আইনের আওতায় রামনাবাদ পাড়ের মধ্যবর্তী টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়াতে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার পায়রা সমুদ্র বন্দরের নাম ফলক উম্মোচন করেন। এর পরই তড়িৎ গতিতে শুরু হয় বন্দরটির নির্মান কাজ।