১২ নভেম্বর উপকূলবাসীর আতঙ্কের দিন

1

কামরুল হাসান, রাঙ্গাবালী : আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর। ১৯৭০ সালের এই দিনে উপকূলীয় এলাকায় ঘটে গেছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস। উপকূলবাসীর কাছে এ এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের দিন। ৪৫ বছর কেটে গেলেও স্বজনহারা মানুষ সেদিনের কথা আজও ভোলেনি। সেদিন বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ক্ষতবিক্ষত করে দেয় স্থানীয় জনপদ।

১৯৭০ সালের এদিন উপকূলে আঘাত হেনেছিল শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। দিনভর টিপ টিপ বৃষ্টি শেষে রাত সাড়ে আট-নয়টার দিকে বঙ্গোপসাগর প্রচন্ড আক্রোশে ফুঁসে উঠেছিল। এ সময়ে উপকূলবর্তী এলাকার অধিকাংশ মানুষ অন্যান্য দিনের মতো কাজকর্ম সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রেডিওতে ছিল না তেমন কোন আগাম সতর্ক সঙ্কেত। তৎকালীন রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে সেদিন পুরো চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র দু’বার স্বাভাবিক আবহাওয়া বার্তা ঘোষণা করা হয়েছিল। তাতে এ ধরনের কোন দুর্যোগের সতর্কবার্তা ছিল না। ছিল শুধু নি¤œচাপ সৃষ্টির খবর। রাত এগারোটার দিকে রেডিও থেকে ‘হ্যারিকেন’ রূপে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হানার ঘোষণা দেয়া হলেও তা ছিল মানুষের অজানা। কারণ ততক্ষণে বঙ্গোপসাগর তার সর্বশক্তি নিয়ে উপকূলে আঘাত হেনেছে। বঙ্গোপসাগরের ফুলে ফেঁপে ওঠা জলরাশির সঙ্গে ছিল তীব্র গতির ¯্রােত ও ঢেউ। ছিল প্রচন্ড বর্ষণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেসে গিয়েছিল উপকূলের লাখো মানুষ। প্রায় সারারাত ধরে উপকূলের ওপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস । ওই জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায়। কেউ গাছের ডালে, কেউ উঁচু মাটির কিল্লায় ও বিল্ডিং এর ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা করলেও ৩ থেকে ৪ দিন অভুক্তই কাটাতে হয়েছে তাদের। সেদিনের কালরাতের ঘূর্ণিঝড়ে পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, চট্টগ্রামসহ উপকূলবর্তী জেলাগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বহু সমৃদ্ধ জনপদ বিশেষ করে উপকূলের অসংখ্য দ্বীপ-চর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেদিন রাতে কত বধূ হারিয়েছে তার স্বামীকে । স্বামী হারিয়েছে স্ত্রীকে। সন্তানহারা হয়েছে কত দম্পতি। ভাই হারিয়েছে ভাইকে। প্রিয় মাকে হারিয়েছে ব্যথাতুর সন্তান। কিংবা স্বজনহারা হয়েছে কত মানুষ। বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনের লাশ খুঁজে পায়নি। প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত স্বজনহারাদের কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ভারি ছিল।

প্রতি বছর ১২ নভেম্বর এলেই নির্দিষ্ট কিছু সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি স্মরণ করে। এ সংগঠনগুলো মিলাদ-মাহফিল, কোরআনখানি ও নিহতদের স্মরণে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কিন্তু এত বড় একটি ঘটনা জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হয় না। উপকুলবাসীর দাবী, ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের ফলে ১০ লাখ লোকের প্রাণহানির ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে দিনটিকে ‘জাতীয় দুর্যোগ দিবস’ ঘোষণা করা হোক। তাহলে দিনটি স্মরণ করতে গিয়ে সবার মধ্যে দুর্যোগ প্রতিরোধের সচেতনতা তৈরি হবে।