জীবন নামের রেল গাড়িটা পায় না খুঁজে স্টেশন

67

এম জাকির হোসাইন, কুয়াকাটা : “জীবন নামের রেল গাড়িটা পায় না খুঁজে স্টেশন, কোন লাইনে গেলে পাবে বলবে তারে কে এখন”–রেলগাড়ির মতোই মানব জীবনের বিচিত্র পথে সৃষ্টি হয় সুখ কিংবা ছন্দহীন নানা দুঃখ কথা।  একটি সংসার, একটু সুখের হাসির জন্য চাকরি নামের সোনার হরিণের পিছনে অক্লান্ত ছুটে চলা। চলমান জীবন পথে কেউ দেখে সাফল্যের হাসি। আবার কাউকে না পাওয়ার দহনে নীরব অশ্রুজল ঝরাতে হয় । জনপ্রিয় ওই গানটির কথাগুলো যেন বলে দেয় এমন একজন হতভাগা মানুষের কথা।

নাম তার মালেক ফরাজি । কুয়াকাটা সংলগ্ন মহিপুর ইউনিয়নের ইউসুফপুর গ্রামের নুরু ফরাজির ছেলে তিনি। বাবা-মা, স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে তার সংসার। সংসারের আর্থিক দৈন্য-দশা ঘোঁচাতে সে পাড়ি জমায় মালয়েশিয়ার পথে। দুষ্ট দালাল চক্রের হাতে পড়ে তাকে বরণ করতে হয় নিষ্ঠুর নিয়তি। ৯ মাস পর ২ ডিসেম্বর গ্রামে ফিরে স্ত্রীকে না পেয়ে তার জীবন যন্ত্রণা ও হতাশা যেন বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পথের মাঝে পথ হারিয়ে সে আজ একেবারে দিশেহারা।

ইউসুফপুর গ্রামে তার বাড়িতে একান্ত আলাপচারিতায় মালেক ফরাজি  জানান তার মর্মান্তিক কাহিনী। তার বিয়ের বয়স ১৩ বছর। কৃষি কাজ করেই চলত তার সংসার। এক পর্যায়ে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান নেন তিনি। একই ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের দূর সম্পর্কীয় আতœীয় জাহাঙ্গীর হোসেনের পরামর্শে চোরাই পথে বিদেশ যেতে উৎসাহিত হন মালেক ফরাজি। তার সাথে পুরান মহিপুরের মাসুদ ও নিজশিববাড়িয়ার আফজালও একই পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য মালেক নগদ ২ লাখ টাকা তুলে দেন জাহাঙ্গীর’র হাতে।

মালেক ফরাজি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানান, জাহাঙ্গীর দালাল চক্রের প্রধান মালয়েশিয়া প্রবাসী নূর হোসেন’র ঘনিষ্ট সহযোগী। সে তাদেরকে নূর হোসেনের ভাইগনা ছামাদ’র মোবাইল নম্বর দিয়ে টেকনাফ পাঠিয়ে দেয়। গত বছরের ১৫ এপ্রিল ওখান থেকে তাদের মোট ৩০ জনকে সামপানে ওঠানো হয় । সারা রাত সামপান চলতে থাকে। সকাল ৬টার দিকে তাদেরকে মিয়ানমারের জল সীমানায় অজ্ঞাত স্থানে নামিয়ে দেয় দালাল চক্র। সেখানে তাদের একদিন রাখার পর তাদেরকে থাইল্যান্ডের একটি তেলবাহী জাহাজে তুলে নেয় চক্রটি। ওই স্থান থেকে পুরুষ- মহিলা-বাচ্ছাসহ মোট দুই হাজার চাকরি প্রত্যাশী যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি।

আর এ জাহাজ থেকেই শুরু হয় তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন। দুই হাজার যাত্রীর মধ্য থেকে তাদের তিন জনসহ ৩০জনকে আলাদা করা হয়। তারপর ২ ঘন্টা ধরে লোহার রড দিয়ে তাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালায় জাহাজে অবস্থানরত দালাল চক্রের লোকজন । এভাবে থেমে থেমে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে ওই ৩০ জনকে। মালেক ফরাজি এর কারণ জানতে চাইলে ওই চক্রটি জানায়, তারা ৩০ জন যাত্রী সুস্থ ও শক্তিশালী। যে কোন সময় দালাল চক্রকে ঘায়েল করতে পারে। এজন্য শুরুতেই শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে।

চোখের জল মুছতে মুছতে মালেক ফরাজি আরও জানান, তাদেরকে অত্যাচারের পাশাপাশি খাবার হিসাবে দেওয়া হতো এক বেলা ভাত, দুইটি শুকনো মরিচ ও দুই বেলা পানি।  এভাবেই ৭ দিন চলতে থাকে জাহাজ। এক পর্যায়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জল সীমানায় যাত্রী-জাহাজ ফেলে রেখে চলে যায় ওই চক্রটি। সকালের আলো বাড়ার সাথে সাথে সেখানে আরও ১৯টি জাহাজ দেখতে পায় যাত্রীরা। ৩ দিন পর মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সাগরে ভাসতে থাকা যাত্রীদের সামান্য খাবার হিসেবে নুডলস, ও পানি বিতরণ করে। তারা ওই সব বিপথগামী যাত্রীকে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু আবারও ধূধূ জলরাশির অজ্ঞাত স্থানে জাহাজ থামিয়ে অবস্থান করতে থাকে। আড়াই মাস ধরে ওখানেই কাটাতে হয় ওই সকল দুর্ভাগা যাত্রীকে। দুই দিন পর পর দেওয়া হতো সামান্য খাবার ও পানি ।

জীবন-মরণের ফাঁদে পড়ে বাঁচার আহাজারি চলে যাত্রীদের মাঝে। একটু পানি পানি বলে কেউ কান্নাকাটি করলেও তাকে গুলি করে ফেলে দেয়া হয় গভীর সমুদ্রে। অত্যাচারী চক্রটির হাতে ধর্ষিত হতে থাকে মিয়ানমারের অসংখ্য মুসলিম নারী। এক পর্যায়ে জাহাজগুলোর ভাড়ার মেয়াদ শেষ হয়। পুনরায় থাইল্যান্ড থেকে ৫টি জাহাজ নিয়ে আসে ওই চক্রটি। ২০টি জাহাজের সকল যাত্রীকে ওঠানো হয় ৫টি জাহাজে। এতে পদদলিত হয়ে মারা যায় অনেকে।

হঠাৎ রাত ৮টার দিকে একটি হাই স্পিড বোট এসে জাহাজের কাছে থামে। কিছুক্ষণ পর জাহাজে অবস্থানরত দালাল চক্রের লোকদের নিয়ে হাই স্পিড বোটটি চলে যায়। ভাসমান জাহাজে যাত্রীদের বিপদ বুঝতে পেরে ইন্ডোনেশিয়ার জেলেরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। জেলেরা যাত্রীদের ইন্দোনেশিয়ার সীমান্তে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত চলে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় শরণার্থী শিবিরে তাদের ঠাঁই হয়। এ শিবিরে আশ্রয় নিয়েই নতুন জীবন ফিরে পায় মালেক, মাসুদ ও আফজালসহ আরও অনেকে। ইন্দোনেশিয়ার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সরকার বাংলাদেশী যাত্রীদের ৯ মাস পর ফিরিয়ে আনে দেশে।

দালালের হাতে প্রতারিত হয়ে এক বুক হতাশা নিয়ে গ্রামে ফেরেন তিনি। দেশে ফিরে এসেও মালেকের জীবনের ট্রাজেডি শেষ হয় না। ঘরে ঢুকে খবর নিয়ে তিনি জানতে পেলেন- তার স্ত্রী নেই। দুই মাস আগেই একই গ্রামের সহিদ মারুব্বরের সাথে চলে গেছে সে। মালেক তার নতুন জীবন ফিরে পাবার করুণ কাহিনী খুলে বলার এক পর্যায়ে হাউ মাউ করে কেঁদে বললেন, “ মুই যারে লইয়্যা সুহের সোংসার গড়মু, যার সুহের লইগ্যা দুই লাখ টাহা দিয়াও বিদ্যাস যাইতে পারি নাই, হেই ডাইনি সিক্সে পড়া মাইয়াডারে থুইয়া ক্যামনে ছাইড়্যা যাইতে পারলো! মুই দুই লাখ টাহাও খুয়াইলাম, হ্যারপর ঘরে আইয়া দেহি বউডাও নাই… এহন মুই কুম্মে যামু!” একদিকে টাকার শোক, অপরদিকে স্ত্রীহারা হয়ে ন্যায্য বিচারের দাবীতে সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের পিছনে ছুটতে থাকেন ভাগ্যবিড়ম্বিত মালেক ফরাজি। ###